উত্তর আমেরিকার মাটিতে ফুটবল বিশ্বকাপের মেগা আসর শুরু হতে আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি। বিশ্বমঞ্চের সেই মহাযুদ্ধের মাঠে নামার আগেই মাঠের বাইরের এক পরম প্রাপ্তিতে ভূষিত হলেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা মহাতারকা লিওনেল মেসি। তাঁর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের অর্জনের বিশাল মুকুটে যুক্ত হলো আরও একটি জমকালো আন্তর্জাতিক পালক। ক্রীড়াক্ষেত্রে অসামান্য অবদান এবং মাঠের বাইরে মানবিক কর্মকাণ্ডের জন্য স্পেনের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী সম্মাননা ‘প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস’ (Princess of Asturias Award for Sports) জয় করেছেন এই আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
স্পেনের ওভিয়েদোতে বসেছিল এই পুরস্কারের জন্য গঠিত বিচারক প্যানেলের দুই দিনব্যাপী বিশেষ পর্যালোচনা বৈঠক। বিশ্বের ১২টি ভিন্ন দেশের মোট ২৭ জন খ্যাতনামা মনোনীত ব্যক্তির প্রোফাইল ও অবদান মূল্যায়ন করে শেষ পর্যন্ত বিচারকেরা এই শীর্ষ পুরস্কারের জন্য সর্বসম্মতিক্রমে লিওনেল মেসিকে নির্বাচিত করেন।
যে কারণে অনন্য এই সম্মাননা
পুরস্কার ঘোষণার সময় বিচারক কমিটির প্রধান তথা বিখ্যাত প্যারালিম্পিক সাঁতারু তেরেসা প্যারালস মেসির ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘এটি কেবল মেসির মাঠের ফুটবল প্রতিভার স্বীকৃতি নয়। তাঁর অবিশ্বাস্য ক্রীড়া ক্যারিয়ারের পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং উন্নত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘদিনের যে নিঃস্বার্থ মানবিক অবদান—তারই এক পরম মূল্যায়ন এই পুরস্কার।’
পেশাদার ফুটবলে দীর্ঘ ২৩ বছরের পথচলায় লিওনেল মেসির সাফল্য আজ যেকোনো বিতর্কের ঊর্ধ্বে। ক্লাব ও আন্তর্জাতিক ফুটবলের আঙিনায় পা রেখে তিনি রেকর্ড সর্বোচ্চ ৪৭টি শিরোপা নিজের শোকেসে তুলেছেন।
অর্জনে ঠাসা ৪৭ শিরোপার মহাকাব্য
মেসির ক্লাব ক্যারিয়ারের সিংহভাগ কেটেছে স্প্যানিশ জায়ান্ট বার্সেলোনায়।
কাতালানদের হয়ে তিনি ১০টি লা লিগা, ৭টি কোপা দেল রে এবং ৮টি স্প্যানিশ সুপার কাপের স্বাদ পেয়েছেন। এছাড়া বার্সার জার্সিতেই তিনি উঁচিয়ে ধরেছেন ৪টি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ৩টি ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ এবং ৩টি উয়েফা সুপার কাপ। স্পেনের পাঠ চুকিয়ে ফরাসি ক্লাব পিএসজিতে গিয়ে জেতেন ২টি লিগ ওয়ান ও ১টি ফরাসি সুপার কাপ। আর বর্তমানে আমেরিকার ক্লাব ইন্টার মায়ামির হয়ে জিতেছেন লিগস কাপ, এমএলএস সাপোর্টার্স শিল্ড এবং এমএলএস কাপের শিরোপা।
আলবিসেলেস্তেদের হয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চেও তাঁর ট্রফি জয়ের তালিকাটি রূপকথার মতো।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পাশাপাশি তিনি ব্যাক-টু-ব্যাক ২টি কোপা আমেরিকা, ১টি ফিনালিসিমা, অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ এবং ২০০৮ বেইজিং অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জিতেছেন। ব্যক্তিগত অর্জনে ৮টি ব্যালণ ডি’অর, ৬টি ইউরোপিয়ান গোল্ডেন বুট ও ৩টি ফিফা ‘দ্য বেস্ট’ পুরস্কারসহ বিশ্বকাপের মঞ্চে দুবার টুর্নামেন্ট সেরার (গোল্ডেন বল) অনন্য রেকর্ড রয়েছে তাঁর।
ফুটবলের ইতিহাসে প্রথম ও মেসির মানবিক রূপ
মাঠের জাদুর আড়ালে মেসির যে এক বিশাল মানবিক হৃদয় রয়েছে, তা আবারও সামনে এলো। ২০০৭ সালে নিজের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেন ‘লিও মেসি ফাউন্ডেশন’। এই সংস্থার মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও চিকিৎসায় প্রতিনিয়ত কাজ করছেন তিনি, যা বিচারকদের মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছে।
প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস ক্রীড়া পুরস্কারের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এবারই প্রথম কোনো ফুটবলার একক ব্যক্তি হিসেবে এই অনন্য সম্মাননা অর্জন করলেন।
এর আগে ফুটবল দুনিয়া থেকে যৌথ বা দলগতভাবে এই সম্মান পেয়েছিল ২০০২ সালের ব্রাজিল দল, ২০১০ সালের বিশ্বকাপজয়ী স্পেন দল এবং ২০১২ সালে যৌথভাবে ইকার ক্যাসিয়াস ও জাভি হার্নান্দেজ। গত বছর এই পুরস্কার ওড়েনি কোনো ফুটবলারের হাতে, সেটি জিতেছিলেন টেনিস কিংবদন্তি সেরেনা উইলিয়ামস। সেরেনার উত্তরসূরি হিসেবে এবার যুক্ত হলো মেসির নাম। এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের অংশ হিসেবে মেসি একটি বিশেষ মেডেল, সনদপত্র, স্প্যানিশ শিল্পী হুয়ান মিরোর ভাস্কর্যের একটি প্রতিরূপ এবং ৫০ হাজার ইউরো অর্থমূল্য পাবেন।

