Aston Villa lifting the Europa League trophy in Istanbul.দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বাদে উচ্ছ্সিত অ্যাস্টন ভিলা। ছবি: রয়টার্স

সাড়ে তিন বছর আগে যখন উনাই এমেরি ভিলা পার্কের ড্রেসিংরুমে পা রেখেছিলেন, তখন সমর্থকদের একটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। স্প্যানিশ এই মাস্টারমাইন্ড স্পষ্ট করে বলেছিলেন, তিনি অ্যাস্টন ভিলায় এসেছেন ট্রফি জিততে।

বুধবার রাতে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে ফ্রাইবার্গকে ৩-০ গোলে গুঁড়িয়ে দিয়ে নিজের সেই কথা রাখলেন এমেরি। জার্মান ক্লাবটিকে উড়িয়ে দিয়ে ৩০ বছর পর কোনো বড় শিরোপা উঁচিয়ে ধরল ভিলা। অধিনায়ক জন ম্যাকগিনের হাত ধরে ইউরোপা লিগের ট্রফি জয়ের মাধ্যমে ক্লাবের ইতিহাসে যোগ হলো এক সোনালী অধ্যায়।

১৯৮২ সালের সেই জার্মানি বধের পুনরাবৃত্তি

ইস্তাম্বুলের গ্যালারিতে তখন উপস্থিত ছিলেন ১৯৮২ সালের ইউরোপীয় কাপজয়ী ভিলার ১৯ জন নায়কের মধ্যে ৯ জন। কিংবদন্তি অধিনায়ক ডেনিস মর্টিমার এবং ফাইনালে গোল করা পিটার উইদদের সামনেই রচিত হলো নতুন রূপকথা।

মজার ব্যাপার হলো, এবারও ভিলা মাঠে নেমেছিল সাদা জার্সি গায়ে আর প্রতিপক্ষ জার্মান দলটি ছিল লাল জার্সিতে। ৪৪ বছর আগে বায়ার্ন মিউনিখকে হারিয়ে রটারডামে ইতিহাস গড়েছিল ভিলা। এবার বায়ার্নের জায়গায় ছিল ফ্রাইবার্গ আর রটারডামের জায়গায় ইস্তাম্বুল।

সেই রাতে পিটার উইদ গোল করেছিলেন, আর এবার গোল এলো ইউরি তিয়েলেমানস, বুয়েন্দিয়া এবং মর্গান রজার্সের পা থেকে।

ইউরোপের অঘোষিত রাজা উনাই এমেরি

এই জয়ের মাধ্যমে কোচ হিসেবে নিজের রেকর্ড আরও উঁচুতে নিয়ে গেলেন উনাই এমেরি। ইউরোপা লিগের ইতিহাসে এটি তাঁর পঞ্চম শিরোপা। মোট ৬টি ফাইনাল খেলে ৫টিতেই জয়ের মুখ দেখলেন এই স্প্যানিশ বস।

ভিলার কর্মকর্তারা আগে থেকেই ট্রফি প্যারেডের আয়োজন নিয়ে কিছুটা চিন্তিত ছিলেন। কারণ বার্মিংহামে এমন উৎসবের কারণে বড় ধরণের বিঘ্ন ঘটতে পারে। তবে সব শঙ্কা উড়িয়ে বৃহস্পতিবার বিকেলেই ট্রফি নিয়ে শহরে ভিক্টরি প্যারেড করবে পুরো দল।

ঐতিহাসিক এই জয়ের পর এমেরি বলেন, “আমি ক্লাব মালিক নাসেফ সাউইরিস এবং ওয়েস এডেনসের প্রতি কৃতজ্ঞ, তারা সবসময় সমর্থন দিয়েছেন। ধন্যবাদ জানাই ভক্ত ও খেলোয়াড়দের। আমার এই টুর্নামেন্টের সাফল্যের পেছনে সবসময় ভালো খেলোয়াড়রা অবদান রেখেছে। আমরা সবাই মিলে আজ রাজা। ১৯৮২ সালের পর এই ট্রফিটি ভক্তদের বড় চাওয়া ছিল। আমরা এখানেই থামব না।”

তিয়েলেমানস-বুয়েন্দিয়ার গোল ও সাবেক তারকার লাফ

ম্যাচের শুরুতেই কর্নার থেকে চমৎকার ভলিতে গোল করে দলকে এগিয়ে নেন ইউরি তিয়েলেমানস। এরপর বুয়েন্দিয়ার দর্শনীয় কোণাকুনি শট যখন ফ্রাইবার্গের জালে জড়ায়, তখনই ট্রফিতে এক হাত দিয়ে ফেলে ভিলা।

গ্যালারিতে বসা ভিলার সাবেক মিডফিল্ডার ইয়ান টেইলর তখন আনন্দে প্রেস বক্সের চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে ওঠেন। ১৯৯৬ সালে ভিলার সবশেষ লিগ কাপ জয়ের ফাইনালে গোল করেছিলেন এই তারকা।

দলের হয়ে মর্গান রজার্স যখন তৃতীয় গোলটি করেন, তখন ডাগআউটে উনাই এমেরির উদযাপন ছিল দেখার মতো।

ম্যাচ শেষে তিয়েলেমানস বলেন, “শুরুটা আমাদের খুব বাজে হয়েছিল। কিন্তু যেভাবে আমরা ঘুরে দাঁড়িয়েছি, তার পুরো কৃতিত্ব খেলোয়াড় এবং স্টাফদের। আগামী মৌসুমে আমরা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ খেলব, সাথে এই ট্রফি—সব মিলিয়ে অসাধারণ।”

প্রিন্স উইলিয়ামের ফাইনাল উপভোগ ও মাঠের আবেগ

ম্যাচের শুরুতে অবশ্য কিছুটা ধাক্কা খেয়েছিল ভিলা। ওয়ার্ম-আপের সময় গোলরক্ষক ইমি মার্টিনেজের ডান হাতের অনামিকায় টেপ বাঁধতে হয়েছিল। যা ১৯৮২ সালের ফাইনালে মাত্র ৯ মিনিটে জিমি রিমারের চোট পেয়ে মাঠ ছাড়ার স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছিল।

তবে সেই শঙ্কা টেকেনি। বেসিকতাস পার্কের গ্যালারি ভরিয়ে তুলেছিল প্রায় ২০ হাজার ভিলা সমর্থক, যদিও অফিশিয়াল টিকিট বরাদ্দ ছিল ১০,৭৫৮টি। ইস্তাম্বুলের তাকসিম স্কয়ারের ক্যাফেগুলো তখন সাদা-কালো উৎসবে মাতোয়ারা।

গ্যালারিতে বসে নিজের ফোন দিয়ে ট্রফি জয়ের মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দী করছিলেন ব্রিটেনের হবু রাজা প্রিন্স উইলিয়াম।

ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজতেই ফুটবল অপারেশন্সের প্রধান ড্যামিয়ান ভিডাগানি মাথায় হাত দিয়ে যেন সব চাপ থেকে মুক্তি পেলেন। মার্টিনেজ নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারছিলেন না, যার কাঁধে চড়ে মাঠে উল্লাস করেন কোচ এমেরি।

পিএসআর বাধা ও ভিলার নতুন নায়কদের ব্যানার

ইউরোপীয় ফুটবলে ইংলিশ ক্লাবগুলোর সম্ভাব্য ‘ট্রেবল’ বা তিনটি ট্রফি জয়ের প্রথমটি এলো ভিলার হাত ধরে। আগামী সপ্তাহে কনফারেন্স লিগের ফাইনালে রায়ো ভায়েকানোর মুখোমুখি হবে ক্রিস্টাল প্যালেস এবং ৩০ মে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে পিএসজির লড়বে আর্সেনাল। উয়েফা হয়তো ইংলিশদের এই দাপট নিয়ে চিন্তিত হতে পারে, কিন্তু ভিলা এখন আত্মহারা।

লিভারপুলকে ৪-২ গোলে হারিয়ে প্রিমিয়ার লিগের শীর্ষ পাঁচে থেকে আগেই চ্যাম্পিয়ন্স লিগ নিশ্চিত করেছিল তারা। ২০২২ সালে যখন এমেরি দায়িত্ব নেন, তখন ভিলা রেলিগেশন জোন থেকে মাত্র ৩ পয়েন্ট ওপরে ছিল। আর্থিক নানা বিধিনিষেধ (পিএসআর) মেনে প্রতি বছর তারকা খেলোয়াড় বিক্রি করার পরও ভিলাকে এই উচ্চতায় আনা এক অলৌকিক ঘটনা। মাত্র ৫.২ মিলিয়ন পাউন্ডে ভিয়াবিয়াল থেকে এমেরিকে আনা ছিল ক্লাব ইতিহাসের সেরা ডিল।

বিশ্বকাপের পর ১৬ মিলিয়ন পাউন্ডে মিডলসবরো থেকে আসা রজার্স হয়তো ক্লাব ছাড়তে পারেন, তবে তিনি যাচ্ছেন একজন ইউরোপা বিজয়ী হিসেবে। ৪৪ বছর আগে পিটার উইদের গোল নিয়ে ভিলা পার্কের ডাগ এলিস স্ট্যান্ডে একটি ব্যানার টাঙানো হয়েছিল।

ইস্তাম্বুলের এই রূপকথার পর এবার নতুন নায়কদের জন্য নতুন ব্যানার তৈরির সময় এসেছে।

আরও পড়ুন:
ইউরোপার ‘রাজা’ এমেরি: ৪৪ বছর পর ট্রফির অপেক্ষায় অ্যাস্টন ভিলা