আমেরিকান প্রবাসী ফুটবলার রোনান সুলিভান ও ডেক্ল্যান সুলিভান এখন বাংলাদেশ ফুটবলের তারকা।রোনান-ডেক্ল্যানরা এখন বাংলাদেশের ফুটবলের নতুন তারকা।

আটলান্টিক মহাসাগরের ওপারে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া। সেখানে মেজর লিগ সকারের (MLS) নামী ক্লাব ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের ড্রেসিংরুমে তখন পিনপতন নীরবতা। লকার রুমে বসে লিওনেল মেসির প্রতিপক্ষ কুইন সুলিভান সতীর্থদের নিয়ে মোবাইলের স্ক্রিনে তাকিয়ে। কয়েক হাজার মাইল দূরে মালদ্বীপের মালে স্টেডিয়ামে তখন ১২ নম্বর জার্সি পরা এক কিশোর পেনাল্টি শট নিতে প্রস্তুত। কুইন চিৎকার করে উঠলেন— ‘চিপ ইট, রোনান!’ ছোট ভাই ঠিক তাই করলেন। পানেঙ্কা শটে ভারতীয় গোলরক্ষককে বোকা বানিয়ে বল জালে জড়াতেই মালের আকাশে উড়ল লাল-সবুজ পতাকা। সাফ অনূর্ধ্ব-২০ ফুটবলে টানা দ্বিতীয়বার পরাশক্তি ভারতকে ধুলোয় মিশিয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ!

রোনান সুলিভান: বাংলাদেশের বহু প্রতীক্ষিত ‘নাম্বার নাইন’

পুরো টুর্নামেন্টে রোনান সুলিভান (Ronan Sullivan) ছিলেন স্রেফ অপরাজেয়। ১২ নম্বর জার্সি গায়ে জড়ালেও মাঠে তিনি খেলেছেন খাঁটি ‘নাম্বার নাইন’ পজিশনে। পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেই দর্শনীয় ফ্রি-কিক আর নিখুঁত হেডে জোড়া গোল করে জানান দিয়েছিলেন—তিনি বিশেষ কিছু করতে এসেছেন। ভারতের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে রিয়াদের করা গোলের কারিগরও ছিলেন এই রোনান।

তাঁর ‘গেম সেন্স’ এবং বক্সের ভেতর ক্ষিপ্রতা প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের জন্য ছিল আতঙ্কের নাম। ফাইনালের সেই রুদ্ধশ্বাস টাইব্রেকারে যখন অভিজ্ঞরাও স্নায়ুচাপে ভোগেন, তখন রোনানের সেই আত্মবিশ্বাসী ‘পানেঙ্কা’ শটই প্রমাণ করে তাঁর বিশ্বমানের ফুটবল প্রতিভা।

ডেক্ল্যান সুলিভান: বদলি নামা এক ‘গেম চেঞ্জার’

রোনান যদি হন গোলমেশিন, তবে তাঁর যমজ ভাই ডেক্ল্যান (Declan) ছিলেন কৌশলী উইঙ্গার। মাত্র দুটি ম্যাচে বদলি হিসেবে নামার সুযোগ পেলেও ডেক্ল্যান যা করেছেন, তা রীতিমতো অবিশ্বাস্য।

ফাইনালে দ্বিতীয় মহূর্তের ১৫ মিনিট পর যখন ভারতের আক্রমণ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিল বাংলাদেশ, তখন ডেক্ল্যানকে নামিয়ে পাশা উল্টে দেন কোচ। নিজের প্রান্ত দিয়ে দুর্দান্ত সব ড্রিবলিংয়ে ভারতীয় রক্ষণকে তটস্থ করে রেখেছিলেন তিনি। এমনকি ম্যাচের শেষ মুহূর্তে দূর থেকে ভাই রোনানকে যে পাসটি দিয়েছিলেন, সেটিই হতে পারত জয়সূচক গোল। ডেক্ল্যানের সেই বুদ্ধিদীপ্ত ফুটবল নিশ্চিত করেছে যে, সুলিভান ব্রাদার্স (Sullivan Brothers) কেবল নামে নয়, কামেও বাংলাদেশের ফুটবলের অমূল্য সম্পদ।

মুক্তিযোদ্ধা নানির শিকড় ও আমেরিকান ড্রেসিংরুমে উল্লাস

ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের এক খাবারের ভিডিওতে যখন বড় ভাই কুইন তাঁদের নানি বীর মুক্তিযোদ্ধা সুলতানা আলমের কথা বলছিলেন, তখনই প্রথম জানা যায় তাদের শিকড়ের কথা। সুলতানা আলম উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে বিয়ে করেন জার্মান অধ্যাপক ক্লাউস ক্রিপেনডর্ফকে।

সেই শিকড়ের টানেই আমেরিকা ছেড়ে বাংলাদেশের জার্সিতে নাম লেখানো। রোনান-ডেক্ল্যান গোল করার পর যখন লাল-সবুজ পতাকা নিয়ে দৌড়ান, তখন সেই উল্লাস ছুঁয়ে যায় কয়েক হাজার মাইল দূরের ফিলাডেলফিয়া ড্রেসিংরুমকেও। আমেরিকান ফুটবলারদের সেই উল্লাস প্রমাণ করেছে—রক্তের টান কোনো ভৌগোলিক সীমানা মানে না।

আরও পড়ুন: ভারতকে টাইব্রেকারে হারিয়ে সাফে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ

আগামীর স্বপ্ন

আইরিশ কোচ মার্ক কক্স এবং দেশীয় কোচ আকবর হোসেন রিদনের হাত ধরে এই অনূর্ধ্ব-২০ দলটি এখন এক দুর্ভেদ্য পরিবার। গোলরক্ষক মাহিনের সেই অবিশ্বাস্য পেনাল্টি সেভ আর সুলিভান ভাইদের আমেরিকান ডুয়েট—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে নতুন এক শক্তির নাম। রোনান-ডেক্ল্যানদের হাত ধরে বাংলাদেশের ফুটবল কি তবে এশীয় মঞ্চেও ওড়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করতে পারে?