ICC and BCB Cricfoot24

ভারতে গিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলবে না বাংলাদেশ—এই অবস্থান এখন আর কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। আইসিসির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরও নিজেদের অবস্থানে অনড় থেকে এবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডিসপিউট রেজোল্যুশন কমিটির হস্তক্ষেপ চেয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। অর্থাৎ বিষয়টি এখন সরাসরি আইসিসির প্রশাসনিক গণ্ডি ছাড়িয়ে আইনি ও কাঠামোগত সমাধানের পথে হাঁটছে।

আইসিসি পরশু জানিয়ে দিয়েছে, আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে ভারতের ভেন্যুতেই খেলতে হবে। এই সিদ্ধান্তের পর সরকারের সঙ্গে আলোচনার জন্য ২৪ ঘণ্টা সময় চেয়েছিল বিসিবি। তবে সেই সময়সীমা পার হলেও বাংলাদেশের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং নিরাপত্তা ঝুঁকির যুক্তি তুলে ধরে বিসিবি আবারও আইসিসিকে জানিয়ে দিয়েছে—ভেন্যু পরিবর্তন না হলে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে অংশ নেবে না।

গতকাল বিকেলে ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে থাকা ক্রিকেটারদের সঙ্গে বৈঠক করেন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সামনে এসে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘আমাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হওয়ার কোনো রকম সুযোগ নেই।’

এই বক্তব্যে মূলত সরকারের অবস্থানই পরিষ্কার হয়েছে—আইসিসির সিদ্ধান্ত থাকলেও নিরাপত্তার প্রশ্নে আপস করবে না বাংলাদেশ।

এই অবস্থানের প্রতিফলন ঘটেছে বিসিবির সাম্প্রতিক পদক্ষেপেও। গতকাল আবারও আইসিসির কাছে ই-মেইল পাঠিয়েছে বোর্ড। সেখানে বাংলাদেশের ভেন্যু পরিবর্তনের দাবিটি যেন আইসিসির স্বাধীন ডিসপিউট রেজোল্যুশন কমিটির কাছে পাঠানো হয়—সেই অনুরোধ জানানো হয়েছে।

আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী, কোনো সদস্য দেশের সঙ্গে সংস্থাটির সিদ্ধান্ত নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে স্বাধীন আইনজীবীদের সমন্বয়ে গঠিত এই কমিটি বিষয়টির নিষ্পত্তি করে থাকে।

বিসিবির আশা, আইসিসি আনুষ্ঠানিকভাবে এই কমিটিকে সম্পৃক্ত করবে এবং সেখানে বাংলাদেশের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত যুক্তিগুলো গুরুত্ব পাবে। যদিও আইসিসি পরশুর ঘোষণার পর এ বিষয়ে আর কোনো প্রকাশ্য মন্তব্য করেনি। একই সঙ্গে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) শুরু থেকেই নীরব অবস্থান বজায় রেখেছে।

এই টানাপোড়েনের প্রভাব সরাসরি পড়ছে টুর্নামেন্টের অংশগ্রহণ কাঠামোর ওপর। আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি ভারত ও শ্রীলঙ্কায় শুরু হওয়ার কথা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের। প্রথম পর্বে বাংলাদেশের চারটি ম্যাচই নির্ধারিত ছিল ভারতের দুই শহর—কলকাতা ও মুম্বাইয়ে। ভেন্যু পরিবর্তন না হলে বাংলাদেশ যে ওই ম্যাচগুলো খেলতে যাবে না, সেটি এখন কার্যত নিশ্চিত বলেই ধরে নেওয়া হচ্ছে।

সরকার কী পরিস্থিতিতে এই সিদ্ধান্তে এসেছে, সেটিও ক্রিকেটারদের সঙ্গে বৈঠকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আসিফ নজরুল।

বৈঠকের বিস্তারিত প্রকাশ না করা হলেও জানা গেছে, ক্রিকেটাররা সরকারের সিদ্ধান্তে আপত্তি তোলেননি। বরং তাঁরা জানিয়েছেন, খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামাই তাঁদের কাজ। তবে অভিভাবক হিসেবে সরকার ও বিসিবি যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটিকেই তাঁরা সম্মান করবেন।

নিরাপত্তা শঙ্কার পেছনে সাম্প্রতিক একটি ঘটনাকে বিশেষভাবে সামনে আনছে বাংলাদেশ। ৩ জানুয়ারি কিছু উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হুমকির মুখে মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায় বিসিসিআই। সেই ঘটনার পর থেকেই ভারতের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে বিসিবি। ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের মতে, সেই পরিস্থিতির মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়নি।

এদিকে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিশ্বকাপ খেলতে বাংলাদেশ পুরোপুরি প্রস্তুত। তবে নিজেদের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় আয়োজনের দাবিতে বোর্ড শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে। তাঁর ভাষায়, ভেন্যু পরিবর্তনের দাবিটি ডিসপিউট রেজোল্যুশন কমিটির কাছে পাঠানোর অনুরোধ সেই কৌশলেরই অংশ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিসিবির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আইসিসির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসা পর্যন্ত তারা আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের দাবি জানিয়ে যাবেন। অর্থাৎ বাংলাদেশের অবস্থান এখন আর আবেগ বা কূটনৈতিক চাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই—এটি পরিণত হয়েছে আইসিসির কাঠামোর ভেতরেই একটি নিয়মতান্ত্রিক লড়াইয়ে।

বিশ্বকাপের মাঠের বাইরে এই লড়াই শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন ক্রিকেট বিশ্ব দেখছে।