ক্রিকফুট২৪ডটকম ডেস্ক:
খরচ হবে কমপক্ষে ১৪ কোটি টাকা, বিনিময়ে পাওয়া যাবে প্রায় ৮ কোটি টাকা। সঙ্গে প্রায় ১ মাস ধরে নানান সংবাদ মাধ্যমে ইন্টারভিউ দিয়ে চেহারা দেখানোর সুযোগ আর ডাগআউটের পাশে সোফায় বসে ম্যাচ দেখা। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের একটি দলের মালিক হতে হলে ক্রিকেটের প্রতি ভালবাসার সঙ্গে ৬ মাসে জন্য ১০ কোটি টাকার নিঃশর্ত ব্যাঙ্ক গ্যারান্টিও জমা দিতে হবে।

বিপিএলের দলের ফ্র্যাঞ্চাইজি স্বত্ব বিক্রির জন্য আগ্রহপত্র চেয়েছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। আর্থিক অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনায় বার বার বিতর্কিত হয়েছে বিপিএল, সেই কলঙ্ক গোচাতে বিদেশী স্পোর্টস ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিটা হবে হবে করেও হচ্ছে না। ওয়েবসাইটে প্রকাশিত আগ্রহপত্রের বিশদ বিবরণীতে বিসিবি জানিয়েছে, এবারে বিপিএলে দল নিতে গেলে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের জন্য অনেক কঠিন শর্তই দিয়ে রেখেছে বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল।

বিপিএলের আগামী ৫ আসরের জন্য অর্থাৎ ১২তম আসর থেকে ১৬তম আসর/মৌসুম পর্যন্ত সময়ের জন্য ফ্র্যাঞ্চাইজির স্বত্ব বিক্রি করবে বিসিবি। আগ্রহী ক্রেতা হিসেবে ব্যবসায়িক সংস্থার বছরে অন্তত ১০০০ কোটি টাকা আয় থাকতে হবে। শুধু তাই নয়, অন্তত ১০০ কোটি টাকা বছরে বিপনন, ব্র্যান্ডিং এবং কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার খাতে খরচ করার প্রমাণ দেখাতে হবে। কোন তামাক, বেটিং, মাদক, অ্যালকোহল পানীয় তৈরির প্রতিষ্ঠান এবং বিসিবি ও আইসিসির সঙ্গে এখনো নিষ্পত্তি না হওয়া বিরোধ থাকলে সেটা অযোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হবে।

প্রথম বছরে ফ্র্যাঞ্চাইজি ফি দিতে হবে ২ কোটি টাকা, প্রতি বছর যেটা ১৫% করে বাড়বে। দল চালাতে নুন্যতম খরচ ১২ কোটি টাকা। সঙ্গে দিতে হবে ১০ কোটি টাকার নিঃশর্ত ব্যাঙ্ক গ্যারান্টি, যেটার মেয়াদ থাকবে ৬ মাস। এই হচ্ছে আর্থিক শর্ত। বিনিময়ে ফ্র্যাঞ্চাইজিরা পাবে, মিডিয়া স্বত্ব ও টিকিট বিক্রি থেকে আয়ের ৩০%, ইন-স্টেডিয়া বিজ্ঞাপণ ও ডিজিটাল পেরিমিটার বিলবোর্ডের বিজ্ঞাপণ থেকে ৩০ শতাংশ (১৫+১৫)। চ্যাম্পিয়ন ফ্র্যাঞ্চাইজি পাবে ২.৭৫ কোটি টাকা, রানার্স আপ পাবে ১.৭৫ কোটি টাকা।

বিপিএলের দল মালিকরা ক্রিকেটকে ভালবাসেন, পরিবার পরিজন নিয়ে ডাগআউটের পাশে পেতে রাখা সোফায় বসে খেলা দেখেন আর টুর্নামেন্টের সময় ৫ তারকা হোটেলে দলের সঙ্গে থাকেন। কিন্তু টাকা দেবার বেলায় তাদের নানান ওজর আপত্তি! কেউ বলেন তার টাকার গাছ নেই, কেউ চেক দিলে সেটা বাউন্স কর, এমনকি হোটেলের বিলও দেন না! গত আসরে দূর্বার রাজশাহী, চিটাগং কিংস এই দুই দলের অনেক বকেয়া পাওনাই বিসিবি কেটে রেখেছে তাদের প্রাইজ মানি এবং রাজস্বের প্রাপ্য ভাগ থেকে।

এবারে আর সেই পথে হাঁটবে না বলে অন্তত কাগজে কলমে নিজেদের অবস্থান প্রমাণ করেছে বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল। ২ কোটি টাকার পে অর্ডার জমা দিয়ে করতে হবে আবেদন, সেই আবেদন গৃহিত হয়ে লেটার অব ইন্টেন্ট ইস্যুর ১৫ দিনের মধ্যে ১০ কোটি টাকা ৬ মাসের জন্য নিঃশর্ত ব্যাঙ্ক গ্যারান্টি দিতে হবে।

প্রথম মৌসুমে বিপিএল থেকে একটা ফ্র্যাঞ্চাইজির কেমন আয় হতে পারে, তারও একটা সম্ভাব্য খতিয়ান দিয়েছে বিসিবি। জার্সি স্পনসর থে আয় কমপক্ষে ৪ কোটি, বিসিবি থেকে লভ্যাংশ’র ভাগ হিসেবে পাওয়া যাবে ১.০৫ কোটি। ডিজিটাল পেরিমিটার ইনভেন্টরি থেকে ২ কোটি, মার্চেন্ডাইজ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে ৮০ লাখ। এভাবে প্রথম মৌসুমে একটা ফ্র্যাঞ্চাইজি সম্ভাব্য আয় করতে পারে ৭.৮৫ কোটি টাকা, পরবর্তী মৌসুম গুলোতে সেই আয়ে ধাপে ধাপে বেড়ে ৫ বছর পর হতে পারে ১৩.৯৪ কোটি।

আইপিএল এর মত ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে ‘ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি’ হিসেবে দলগুলোর দাম হাজার কোট রূপি ছাড়িয়ে গেছে। কলকাতা নাইট রাইডার্স কিনতে শাহরুখ খানের রেড চিলিজ এন্টারটেইনমেন্টের খরচ হয়েছিল ২০০৮ সালে ৭৫ মিলিয়ন ডলার। এই সময়ে কলকাতা নাইট রাইডার্সের ব্র্যান্ড ভ্যালু ২২৭ মিলিয়ন ডলার, বিক্রির জন্য রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর দাম চাওয়া হচ্ছে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার।

তাই ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের দল স্রেফ ক্রিকেটের প্রতি ভালবাসা দেখানোর জায়গা নয়, মোটা অংকের লাভের ব্যবসাও। যে ব্যবসা চালাতে ক্রিকেটের প্রতি ভালবাসার পাশাপাশি ব্যবসায়িক বুদ্ধি ও উদ্যোগেরও দরকার। অতীতে বিপিএলে বেশিরভাগ দলের মালিকই ছিলেন ভুইফোঁড় ব্যবসায়ী যারা মূলত কোন রাজনৈতিক পরিচয়ে দল চালাতেন। এবারে বিসিবি চাইছে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরা যেন আসেন এই আসরে। তাহলে ক্রিকেটেরও উন্নতি হবে আর আয়ের মুখ দেখলে ব্যবসায়ীরাও আগ্রহ হারাবেন না।