ঘণ্টা চারেকের দীর্ঘ বৈঠক, ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা আর একরাশ প্রত্যাশা—সবই যেন থমকে গেল বাফুফে ভবনের সভাকক্ষে। তাবিথ আউয়ালের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) নির্বাহী কমিটির ষষ্ঠ সভাটি অনেকটা ‘পর্বতের মূষিক প্রসব’-এর মতোই শেষ হলো। গুরুত্বপূর্ণ প্রায় অর্ধেক এজেন্ডা নিয়ে কোনো আলোচনা ছাড়াই মুলতবি হয়েছে সভা। ফলে জাতীয় দলের নতুন কোচ নিয়োগ এবং ফুটবলারদের আলোচিত ‘সাফ কোটা’ বাতিলের দাবি ঝুলেই রইল।
কোচ নিয়োগ: আলোচনায় অনীহা?
জাতীয় ফুটবল দলের স্প্যানিশ কোচ হ্যাভিয়ের কাবরেরার অধ্যায় শেষ হওয়ার পর ভক্তদের নজরে ছিল আজকের সভার ১১ নম্বর এজেন্ডা—‘জাতীয় দলের প্রশিক্ষক নিয়োগ’। নতুন কোচের খোঁজে আবেদন গ্রহণ শুরু হলেও রহস্যজনকভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আলোচনার টেবিলেই ওঠেনি। ১০ নম্বর এজেন্ডার পর সভা আর অগ্রসর না হওয়ায় বিষয়টি অমীমাংসিত থেকে যায়।
মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান আমিরুল ইসলাম বাবু অবশ্য দায় এড়াতে চাইলেন। তাঁর মতে, ন্যাশনাল টিমস কমিটি আগে সুপারিশ করবে, তারপর এটি মূল সভায় আসবে। তবে ফুটবল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোচহীন জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাফুফের এমন ঢিলেঢালা ভাব অশনিসংকেত।
পাঁচ টুর্নামেন্টের পুরনো রেকর্ড
আগামী মৌসুমের ক্যালেন্ডারে পাঁচটি প্রতিযোগিতা (চ্যালেঞ্জ কাপ, বাংলাদেশ লিগ, ফেডারেশন কাপ, স্বাধীনতা কাপ ও সুপার কাপ) রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, গত দুই মৌসুমেও একই ঘোষণা দিয়ে শেষ পর্যন্ত সুপার কাপ ও স্বাধীনতা কাপ আয়োজন করতে ব্যর্থ হয়েছিল বাফুফে!
আরও পড়ুন: হামজা-সুলিভানদের উত্তরসূরি খুঁজতে বাফুফের ‘গ্লোবাল’ মিশন!
টানা ব্যর্থতার অজুহাত হিসেবে সিনিয়র সহ-সভাপতি ইমরুল হাসান গত বছরের ‘পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি’কে সামনে আনলেও এবার তিনি আশাবাদী।
তাঁর দাবি, বর্তমানে স্থিতিশীল সরকার থাকায় এবার সব টুর্নামেন্ট যথাসময়ে মাঠে গড়াবে। বিশেষ করে ২০০৯-১৩ সালের পর বন্ধ হয়ে যাওয়া কোটি টাকার ‘সুপার কাপ’ নিয়ে আবারো আশার বাণী শুনিয়েছে ফেডারেশন।
বাজেট জট ও সাফ কোটা
সভার সিংহভাগ সময় (প্রায় দুই ঘণ্টা) ব্যয় হয়েছে ২০২৫ ও ২০২৬ সালের বাজেট নিয়ে। কিন্তু কোনো ঐকমত্য না হওয়ায় বাজেট অনুমোদন পায়নি। এজন্য পুনরায় জরুরি সভা ডাকা হবে। অন্যদিকে, ৩০-৩৫ জন ফুটবলারের ‘সাফ কোটা’ বাতিলের দাবির চিঠি উত্থাপিত হলেও সে বিষয়ে কোনো সমাধান আসেনি।
বাফুফে বলছে, ফুটবলারদের সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে এই দীর্ঘসূত্রতায় পেশাদার লিগের খেলোয়াড়দের মধ্যে অসন্তোষ আরও দানা বাঁধছে।
আরও পড়ুন: হামজা চৌধুরীর আগমনে ফুটবলে উন্মাদনা, তবু অধরা বাফুফের রোডম্যাপ
কমিটি পুনর্গঠনের সুর
বাফুফে নির্বাচিত হওয়ার পর গঠিত বিভিন্ন স্ট্যান্ডিং কমিটির এক বছরের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় নারী উইং ও গ্রাউন্ডস কমিটি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কর্মকর্তারা। সভায় এসব কমিটি পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানান সহ-সভাপতি ওয়াহিদ উদ্দিন চৌধুরী হ্যাপি।
এছাড়া দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা পাইওনিয়ার লিগ ৫ জুনের মধ্যে শুরু করার ঘোষণাটি ছিল আজকের সভার ইতিবাচক দিকগুলোর একটি।
গোলকধাঁধায় মিডিয়া চেয়ারম্যান!
বাফুফের ব্রিফিং মানেই যেন হাস্যরসের নতুন খোরাক। এর আগে ‘সাইবেরিয়া’কে দেশ বানিয়ে ভাইরাল হওয়া মিডিয়া চেয়ারম্যান আমিরুল ইসলাম বাবু আজকেও ছিলেন স্বরূপে। ব্রিফিংয়ের শুরুতেই আলোচ্যসূচি ‘এজেন্ডা’কে বললেন ‘এজেন্ট’। আবার শীর্ষ পর্যায়ে টুর্নামেন্ট আর লিগের পার্থক্য গুলিয়ে ফেলে দাবি করলেন—আগামী মৌসুমে ‘পাঁচটি লিগ’ হবে!
এমনকি অনূর্ধ্ব-২০ সাফে বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরবকেও তিনি আখ্যা দিলেন ‘অ-২০ লিগ’ হিসেবে। দেশের ফুটবলের অভিভাবক সংস্থার এমন পেশাদারিত্ব নিয়ে ক্রীড়াঙ্গনে হাসাহাসি এখন নিত্যদিনের ঘটনা।

