Neymar and teammates celebrating for Brazil.বিশ্বকাপের আগে মারাকানায় খেলার ঐতিহ্যে ফিরছে ব্রাজিল। ছবি: গেটি ইমেজেস

মারাকানা স্টেডিয়ামকে সাক্ষী রেখে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে কার্লো আনচেলত্তির ব্রাজিল। বিশ্বকাপের বিশ্বমঞ্চে পা রাখার ঠিক আগমুহূর্তে ঘরের মাঠে নিজেদের সমর্থকদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে দেশ ছাড়ার যে আদিম ঐতিহ্য সেলেসাওদের ছিল, তা দীর্ঘ ২৮ বছর পর আবারও ফিরে আসছে। অতীতে ১৯৫৪ থেকে ১৯৯৮ সালের মধ্যবর্তী সময়ে সাতটি ভিন্ন বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার আগে এই বিখ্যাত মাঠে শেষ প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার রেওয়াজ ছিল ব্রাজিলের। তবে ১৯৯৮ সালের পর অজানা এক আক্ষেপে এই প্রথা নির্বাসনে যায়।

অবশেষে ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ড কার্লো আনচেলত্তির ঐকান্তিক ইচ্ছায় প্রায় তিন দশক পর সেই হারিয়ে যাওয়া সোনালী প্রথা ফিরে পাচ্ছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে উড়াল দেওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে এটা নিজেদের শক্তি ও দুর্বলতা পরখ করার মিশন সেলেসাওদের। আজ রোববার দিবাগত রাত ৩টা ৩০ মিনিটে আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে পানামার মুখোমুখি হবে হলুদ জার্সিধারীরা।

এই অন্তিম পরীক্ষা শেষেই সরাসরি আমেরিকার বিমানে উঠবেন নেইমার-ভিনিসিয়ুসদের সতীর্থরা।

রিও ডি জেনেইরোর টান

ফুটবল মহলে কার্লো আনচেলত্তির এই বর্তমান দলটিকে রিও ডি জেনেইরোর নিজস্ব দল হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন অনেকে। কাগজে-কলমে ঘোষিত ২৬ জনের চূড়ান্ত স্কোয়াডে রিও রাজ্যে জন্ম নেওয়া ফুটবলার মাত্র পাঁচজন হলেও, দলের অন্তত নয়জন তারকার ফুটবলীয় ক্যারিয়ার ও আবেগের শেকড় প্রোথিত আছে এই রিও-র বিভিন্ন ক্লাবের সাথে।

এদের কেউ কেউ বর্তমানে এই অঞ্চলের ক্লাবে খেলছেন, আবার কেউবা ইউরোপের শীর্ষ লিগে মাঠ কাঁপালেও ভক্তদের মনে এখনো রাজত্ব করছেন।

এই তালিকায় স্পটলাইট কেড়েছেন তরুণ স্ট্রাইকার রায়ান। ইংলিশ ক্লাব বোর্নমাউথের হয়ে মাঠ কাঁপানো এই কিশোর তুর্কি নিজের ফুটবলীয় আঁতুড়ঘরকে ভোলেননি। রায়ান স্মৃতিচারণ করে বলেন, “আমার জীবনের ১৬ থেকে ১৯ বছর বয়স পর্যন্ত ভাস্কো দা গামা ছিল আমার নিজের ঘরের মতো। সেখানে পড়াশোনা থেকে শুরু করে ফুটসাল ও মূল মাঠের ফুটবল—সবই শিখেছি। ওখানকার মানুষের ভালোবাসার কাছে আমি চিরঋণী।”

অন্যদিকে রিয়াল মাদ্রিদ তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের মনও পড়ে আছে রিও-র ক্লাব ফ্লামেঙ্গোতে। এক সাক্ষাৎকারে ভিনি বলেন, “ইউরোপে বসে গভীর রাতে ফ্লামেঙ্গোর ম্যাচগুলো দেখা কঠিন, তবু আমি সুযোগ হাতছাড়া করি না। ৩-৪ বছরের মধ্যে না হলেও, খুব বেশি বয়স হওয়ার আগেই আমি ফ্লামেঙ্গোতে ফিরব। কারণ এই ক্লাবের হয়ে কোপা লিবার্তাদোরেস জেতা আমার জীবনের অন্যতম স্বপ্ন।”

মারাকানার চিরচেনা গ্যালারিতে আজ ভিনি, রায়ান, ওয়েসলি কিংবা লুইজ হেনরিকদের পায়ে বল গেলেই গ্যালারি ফেটে পড়বে চিৎকারে।

পাশাপাশি বোটাফোগোর প্রতিনিধি দানিলোঁ সান্তোস এবং ফ্লামেঙ্গোর সাবেক ও বর্তমান তারকা দানিলোঁ লুইজ, লেও পেরেইরা, আলেক্স সান্দ্রো ও লুকাস পাকেতারাও ঘরের মাঠে বাড়তি উন্মাদনা পাবেন।

আর্জেন্টিনার আঘাতে ঐতিহ্য বন্ধ

মারাকানার এই বর্ণিল বিদায়ী উৎসব প্রায় তিন দশক বন্ধ থাকার পেছনে জড়িয়ে আছে ১৯৯৮ সালের এক চরম তেতো অভিজ্ঞতা।

সেবার বিশ্বকাপের ঠিক আগে এই মাঠে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হয়েছিল ব্রাজিল। ক্লাউডিও লোপেজের একমাত্র গোলে ব্রাজিল শুধু ম্যাচই হারেনি, আর্জেন্টিনার চোখধাঁধানো পাসিং ফুটবলের সামনে পুরো মারাকানা গ্যালারি নিজেদের দলকে দুয়ো দিয়ে আর্জেন্টাইনদের পক্ষে ‘ওলে’ ধ্বনি তুলেছিল।

ঘরের মাঠের সেই চরম অপমান ও বিদ্রূপের পর সিবিএফ আর কখনোই বিশ্বকাপের আগে মারাকানায় ম্যাচ আয়োজনের সাহস দেখায়নি।

তবে এবারের প্রেক্ষাপট ও লক্ষ্য সম্পূর্ণ আলাদা। দেশের সাধারণ সমর্থকদের সাথে ফুটবলারদের আত্মিক সম্পর্ক আরও মজবুত করতে গত বছরই এই বিদায়ী ম্যাচের ছক কষা হয়। শুরুতে সূচি অনুযায়ী ম্যাচটি পোর্তো আলেগ্রেতে হওয়ার কথা থাকলেও মারাকানার প্রেমে পড়ে ভেন্যু বদলে দেন আনচেলত্তি।

ব্রাজিল দলের কোচের দায়িত্ব নেওয়ার পর ফ্লামেঙ্গো ও দেপোর্তিভো তাচিরার মধ্যকার কোপা লিবার্তাদোরেসের একটি ম্যাচ গ্যালারিতে বসে উপভোগ করেছিলেন তিনি।

সে সময় মারাকানার মহাকাব্যিক পরিবেশ দেখে মুগ্ধ আনচেলত্তি সিবিএফ কর্তাদের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন—“আমরা কি এই জাদুকরী মাঠে খেলব না?”

কোচের সেই একটি মুখের কথাই দীর্ঘ ২৮ বছরের ডেডলক ভেঙে পুরোনো ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য করে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনকে (সিবিএফ)।

আরও পড়ুন:
বিশ্বকাপের সবচেয়ে দামি ৫ দল: আছে ব্রাজিল, নেই আর্জেন্টিনা