Brazil's teenage wonderkid Endrick celebrationg a goal.

ফুটবলের দেশে প্রতি প্রজন্মে একজন করে ‘জাদুকর’ জন্ম নেয়, যার বাঁ পায়ের জাদুতে কিংবা ডান পায়ের বুলেট শটে বুঁদ হয় গোটা বিশ্ব। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপকে সামনে রেখে অনূর্ধ্ব-২১ বিশ্বসেরা তরুণ প্রতিভাদের নিয়ে আমাদের বিশেষ আয়োজনের আজকের পর্বটি সাজানো হয়েছে ব্রাজিলের ফুটবলের এমনই এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে নিয়ে। তিনি আর কেউ নন—রিয়াল মাদ্রিদ ও সেলেসাওদের নতুন আক্রমণভাগের প্রাণভ্রমরা এনড্রিক ফিলিপ। ২০০৬ সালের ২১ জুলাই জন্ম নেওয়া এই গতিদানব ইতিমধ্যেই নিজের শক্তি, নিখুঁত ফিনিশিং ও অবিশ্বাস্য মানসিকতার জোরে বিশ্বফুটবলের ভবিষ্যৎ সেনসেশন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

মাত্র ১৭ বছর বয়সে ২০২৩ সালের নভেম্বরে কলম্বিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে ব্রাজিলের সিনিয়র জাতীয় দলে যখন এনড্রিকের অভিষেক হয়, তখনই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে তিনি বড় মঞ্চের জন্যই তৈরি। সেলেসাওদের ইতিহাসে কিংবদন্তি পেলে, এদু এবং ফিলিপে কৌতিনিয়োর পর চতুর্থ সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়ানোর গৌরব অর্জন করেন এই সেন্টার-ফরোয়ার্ড।

এর ঠিক কয়েক সপ্তাহ আগেই ঘরোয়া লিগে বোটাফোগোর বিপক্ষে প্রথমার্ধে ৩-০ গোলে পিছিয়ে থাকা পালমেইরাসকে একাই টেনে তুলেছিলেন তিনি।

সে ম্যাচে দ্বিতীয়ার্ধে এক অবিশ্বাস্য জোড়া গোল করে দলকে ৪-৩ ব্যবধানে জেতান, যা শেষ পর্যন্ত পালমেইরাসকে লিগ শিরোপা এনে দিয়েছিল।

ওয়েম্বলি থেকে সান্তিয়াগো বার্নাব্যু: রেকর্ডবুকে ওলটপালট

আন্তর্জাতিক মঞ্চে পা রেখেই নিজের জাত চেনাতে সময় নেননি এনড্রিক। ২০২৪ সালের মার্চে ঐতিহ্যবাহী ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১-০ জয়ের একমাত্র গোলটি আসে তার পা থেকেই। এর পরপরই মাদ্রিদে স্পেনের বিপক্ষে ৩-৩ গোলের থ্রিলার ম্যাচেও জালের দেখা পান এই তরুণ।

ইউরোপের ক্লাব ফুটবলে পা রাখার আগেই মেক্সিকোর বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের নাটকীয় গোল করে ব্রাজিলকে ৩-২ ব্যবধানে জেতান তিনি।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে কান্নায় ভেজা চোখে পালমেইরাস সমর্থকদের বিদায় জানিয়ে যখন রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন, স্পেনে গিয়েও ইতিহাস গড়তে সময় নেননি। রিয়াল ভায়াদোলিদের বিপক্ষে বদলি নেমে মাত্র ১৮ বছর ৩৫ দিন বয়সে গোল করে লস ব্লাঙ্কোসদের ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ বিদেশী গোলদাতা বনে যান তিনি। একই বছরের সেপ্টেম্বরে স্টুটগার্টের বিপক্ষে গোল করে কিংবদন্তি রাউল গঞ্জালেসের ১৯৯৫ সালের রেকর্ড ভেঙে রিয়ালের ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ গোলদাতার সিংহাসনও দখল করেন এনড্রিক।

প্রথম মৌসুমে ইউরোপে এসে কার্লো আনচেলত্তির অধীনে কোপা দেল রে-র যৌথ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতাও হন তিনি।

ইনজুরির থাবা ও লিয়ঁতে গিয়ে ‘সিংহ’ হয়ে ওঠার গল্প

২০২৫ সালে এসে ইনজুরির করাল গ্রাসে পড়েন এই ওয়ান্ডারকিড। ফিটনেস ফিরে পেলেও রিয়ালের তারকাখচিত একাদশে তার খেলার সুযোগ কমে আসছিল। কিন্তু সামনে বিশ্বকাপ, দলে জায়গা পাকা করতে মরিয়া এনড্রিক এক সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। ২০২৫-এর অন্তর্বর্তীকালীন উইন্ডোতে রিয়াল ছেড়ে ছয় মাসের ধারে যোগ দেন ফরাসি ক্লাব অলিম্পিক লিওঁতে। ফ্রান্সে গিয়েই যেন নিজের হারিয়ে যাওয়া ধার খুঁজে পান তিনি; ২১ ম্যাচে ৮টি গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে করান আরও ৮টি গোল। অল্প দিনেই লিওঁ সমর্থকদের নয়নের মণি হয়ে ওঠেন।

লোন স্পেল শেষ করে যখন আবার ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দলে ডাক পেলেন, লিওঁকে বিদায় জানানোর সময় এক অবিস্মরণীয় বার্তা দেন এনড্রিক।

লাতিন আমেরিকার এক প্রবাদের উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ব্রাজিলে কেউ কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে গেলে মানুষ বলে, তাকে টিকে থাকতে প্রতিদিন একটি করে ‘সিংহ মারতে’ হবে। আমি এমন এক ইনজুরির মধ্য দিয়ে গিয়েছি যা কোনো ক্রীড়াবিদ চায় না। তবে আমি ঠিক করেছিলাম, আমি কোনো সিংহ মারব না—আমি নিজেই একটা সিংহ হয়ে উঠব।”

এনড্রিককে নিয়ে রথী-মহারথীদের মূল্যায়ন

কার্লো আনচেলত্তি (ব্রাজিল ও রিয়াল মাদ্রিদ কোচ): “ও এক অসাধারণ খেলোয়াড়, ওর আকাশ ছোঁয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী বহু বছর ব্রাজিলের ফুটবলের প্রধান মুখ হতে যাচ্ছে এনড্রিক।”

রোনালদো নাজারিও (বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি): “ও গড-গিফটেড এক ফরোয়ার্ড। রিয়াল মাদ্রিদের মতো ক্লাবে খেললে ওর অভিজ্ঞতা ও শক্তি আরও বহুগুণ বাড়বে।”

রোমারিও (১৯৯৪ বিশ্বকাপজয়ী স্ট্রাইকার): “লিওঁতে গিয়ে ও নিজের চেনা রূপ ফিরে পেয়েছে। ও কঠোর পরিশ্রমী এবং জানে কোন পজিশনে থাকতে হয়। এই মুহূর্তে ও-ই ব্রাজিলের সেরা আউট-এন্ড-আউট স্ট্রাইকার।”

কাফু (দুইবারের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক): “ওর গতি, শক্তি, স্কিল ও ফ্রি-কিক নেওয়ার ক্ষমতা—সবই আছে। ও ব্রাজিলের জার্সিটা গায়ে দেওয়ার সময় কোনো চাপ অনুভব করে না, ও সম্পূর্ণ ভয়হীন।”

ভিনিসিয়ুস জুনিয়োর: “১৫ বছর বয়স থেকে ওকে চিনি, ওর স্বপ্নগুলো এখনো আগের মতোই নিখাদ। ও প্রতিদিন নিজেকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।”

২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের গ্রুপ পর্বের ম্যাচ

১৩ জুন: ব্রাজিল বনাম মরক্কো (নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়াম)

১৯ জুন: ব্রাজিল বনাম হাইতি (ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়াম)

২৪ জুন: স্কটল্যান্ড বনাম ব্রাজিল (মিয়ামি স্টেডিয়াম)

নেইমারদের উত্তরসূরি হিসেবে ব্রাজিলের বহু কাঙ্ক্ষিত ‘হেক্সা’ বা ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের মিশন এবার অনেকটাই নির্ভর করছে এই তরুণের কাঁধে। নিজের ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপে এনড্রিক কি পারবেন পেলের সেই স্মৃতি ফিরিয়ে এনে বিশ্বমঞ্চে ব্রাজিলের নতুন রাজত্ব স্থাপন করতে?

উত্তর মিলবে এই জুনেই!

আরও পড়ুন:
ব্রাজিলকে দুঃসংবাদ দিলেন টানা ৩ বিশ্বকাপে সঠিক প্রেডিকশন করা ক্লেমেন্ট