ভারত ও পাকিস্তানের ক্রিকেট বোর্ড লোগো এবং মাঝখানে আইসিসি লোগো।

মাঠে গড়িয়েছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, তবে মাঠের ক্রিকেট ছাপিয়ে এখন আলোচনায় মাঠের বাইরের ‘রাজনীতি’। একদিকে নিরাপত্তার অজুহাতে ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপ বর্জন করেছে বাংলাদেশ, অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রতি সংহতি জানিয়ে ভারতের বিপক্ষে বহুল প্রতীক্ষিত ম্যাচটি না খেলার ঘোষণা দিয়েছিল পাকিস্তান। তবে শেষমেশ নানা চেষ্টায় তাদেরকে রাজি করানো গেছে।
উপমহাদেশের তিন ক্রিকেট শক্তির এই ত্রিমুখী টানাপোড়েন বিশ্ব ক্রিকেটের ভবিষ্যৎকেই বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আইসিসির অনড় অবস্থান, স্কটল্যান্ডের অন্তর্ভুক্তি এবং ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথ বাতিলের ফলে সৃষ্ট এই গভীর সংকট নিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এ একটি বিশেষ বিশ্লেষণধর্মী কলাম লিখেছেন প্রখ্যাত ক্রিকেট লেখক টিম উইগমোরক্রিকফুট২৪ডটকম’র পাঠকদের জন্য তাঁর সেই লেখাটি হুবহু অনুবাদ করে তুলে ধরা হলো—

এটি ক্রিকেটের এবং সম্ভবত বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনেরই সবচেয়ে মূল্যবান আন্তর্জাতিক দ্বৈরথ। অথচ আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে যখন ভারত ও পাকিস্তানের মুখোমুখি হওয়ার কথা, ম্যাচটি আদৌ মাঠে গড়াবে না। পাকিস্তান ম্যাচটি ছেড়ে দেওয়ার (ফরফিট) সিদ্ধান্ত নিয়েছে; ফলে প্রথম পর্বের সবচেয়ে আকর্ষক এই ম্যাচটি সূচি থেকে মুছে যাচ্ছে। সম্প্রচারকদের এখন চার ঘণ্টার সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে হবে বিকল্প কিছু দিয়ে।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ২০২৬ সালে যে বৃহত্তর সংকট দেখা দিয়েছে, এই অচলাবস্থা তারই একটি ক্ষুদ্র প্রতিফলন মাত্র। সব খেলার মতো ক্রিকেটও সব সময় ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রতিচ্ছবি হয়ে থেকেছে। কিন্তু বর্তমানে এই অস্থিরতা খেলাটি আয়োজন করাকেই অসম্ভব করে তুলছে।

এমনকি পাকিস্তান অন্তত এই বছরের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেটিও বলা যাচ্ছে না; তারা টুর্নামেন্ট থেকেই পুরোপুরি নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছে, যার ফলে তাদের জায়গায় স্কটল্যান্ডকে ডেকে আনা হয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের চরম অবনতির পর, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) যখন বাংলাদেশের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার অনুমতি দিতে অস্বীকার করে, তখনই বাংলাদেশ বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ায়।

পাকিস্তানের সব ম্যাচ—এমনকি তারা যদি ফাইনালে ওঠে তবে সেই ম্যাচটিও—ইতিমধ্যে শ্রীলঙ্কায় আয়োজনের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। গত বছর চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ভারতের সব ম্যাচ সরকারি আয়োজক পাকিস্তানে না হয়ে যেমন সংযুক্ত আরব আমিরাতে হয়েছিল, এই ব্যবস্থা সেই নজিরকেই অনুসরণ করছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এখন এমন বিশৃঙ্খলাই স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে বলা হতো, হাজারো ব্যর্থতা সত্ত্বেও আইসিসির বড় গুণ হলো একটি চমৎকার ইভেন্ট আয়োজন করার ক্ষমতা। কিন্তু টানা দ্বিতীয়বারের মতো একটি পুরুষ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট প্রহসনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়ায় সেই বিচার এখন পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি। গত সপ্তাহে আইসিসির এক বিবৃতিতে যখন বলা হয়— “আইসিসি টুর্নামেন্টগুলো খেলাধুলায় সততা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ধারাবাহিকতা এবং স্বচ্ছতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি, এবং বাছাইকৃত অংশগ্রহণ প্রতিযোগিতার চেতনা ও পবিত্রতাকে ক্ষুণ্ণ করে”, তখন কথাগুলো অনেকটা ‘অরওয়েলীয়’ (বাস্তবতার বিপরীত) বলে মনে হয়েছে।

প্রাচীন রোমের সময় থেকেই রাজনীতি সব সময় খেলায় হস্তক্ষেপ করেছে। কিন্তু বর্তমানের মতো এই সম্পর্ক আগে কখনো এতটা অনিবার্য হয়ে ওঠেনি। উদাহরণস্বরূপ, গত ফুটবল বিশ্বকাপ কাতারে হয়েছে, পরবর্তীটি যৌথভাবে যুক্তরাষ্ট্রে হবে—যেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সম্প্রতি ফিফার প্রথম ‘শান্তি পুরস্কার’ দেওয়া হয়েছে—এবং ২০৩৪ সালের আসরটি হবে সৌদি আরবে। তবে ফুটবলেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মতো বর্তমান পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়নি।

সম্প্রচার চুক্তির ওপর নির্ভরশীল আইসিসি

ম্যাচগুলো সরিয়ে নেওয়া হবে কি না, বা সেগুলো আদৌ মাঠে গড়াবে কি না—তা নিয়ে জটিলতা এখন রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন পাকিস্তানের শেষ মুহূর্তের নাটকীয় সিদ্ধান্ত বদল ছাড়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সবচেয়ে লাভজনক ম্যাচটিই আর হচ্ছে না।

বিশ্ব ক্রিকেটের জন্য এর পরিণাম কতটুকু ভয়াবহ, তা বলে শেষ করা যাবে না। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচটি এতটাই মূল্যবান যে—যা আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে অনন্য এবং আইসিসির তথাকথিত ‘সততা’র পরিপন্থী—টুর্নামেন্টের ড্র এমনভাবে নির্ধারণ করা হয় যাতে এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী সব সময় একে অপরের মুখোমুখি হয়।

এটি টানা ১২তম পুরুষদের বৈশ্বিক ইভেন্ট যেখানে ভারত ও পাকিস্তানকে একই গ্রুপে রাখা হয়েছে। অন্যান্য খেলায় বৈশ্বিক আসরের ড্র অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং সরাসরি দেখার সুযোগ থাকলেও ক্রিকেটের গ্রুপ বিন্যাস অনেকটা দরকষাকষির মতো: শুরুতেই ভারত-পাকিস্তানকে এক গ্রুপে রাখুন, বাকিটা পরে দেখা যাবে।

ভারত ও পাকিস্তানের সাক্ষাৎ নিশ্চিত করা আইসিসির সম্প্রচার চুক্তির একটি অপরিহার্য অংশ। ২০২৪-২৭ চক্রের জন্য জিও-স্টার (JioStar) ভারতীয় স্বত্বের জন্য প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার প্রদান করছে, যা আইসিসির মোট আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ। সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৪-২৭ চক্রে আইসিসির মোট সম্প্রচার মূল্যের ১০ শতাংশ (প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলার) আসে প্রতি টুর্নামেন্টে একটি ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ নিশ্চিত করার গ্যারান্টি থেকে। যদি এ বছরের ম্যাচটি না হয়, তবে সম্প্রচারকরা কি টাকা ফেরত চাইবে? এমনকি যদি নাও চায়, ভবিষ্যতে সম্প্রচারকদের এত বিশাল অর্থ ব্যয়ের আগ্রহ ধসে পড়বে।

ভারত ও পাকিস্তানের এই অচলাবস্থা এমন সময় এলো যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বড় ধরনের আর্থিক কাটছাঁটের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। ভারতের প্রধান দুই ক্রীড়া সম্প্রচারক জিও এবং স্টারের একীভূত হওয়ার ফলে ২০২৮-৩১ চক্রের পরবর্তী আইসিসি স্বত্বের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা নাটকীয়ভাবে কমে যাবে। এটি স্বত্বের মূল্যকে অনেক নিচে নামিয়ে আনবে।

‘তিন মোড়লের’ আধিপত্য বজায় থাকবে

নেদারল্যান্ডস ক্রিকেটের নতুন বার্ষিক প্রতিবেদনে একটি লাইন লুকিয়ে আছে, যেখানে বলা হয়েছে— “আইসিসি ইতিমধ্যে সতর্ক করেছে যে, ২০২৮ সালে মিডিয়া স্বত্ব নবায়নের সময় তাদের রাজস্ব ৩০ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে।” নেদারল্যান্ডসের মতো উৎস থেকে আসায় কথাগুলো সহজে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু কিছু অভ্যন্তরীণ সূত্র আশঙ্কা করছে যে, সম্প্রচার স্বত্বের এই কর্তন আরও ভয়াবহ হতে পারে—সম্ভবত ৫০ শতাংশ পর্যন্ত, যা চার বছরের চক্রে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলারের কমতি।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য এই কর্তন হবে ভূমিকম্পের মতো। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ও ভারতের জন্য আইসিসির টাকা তাদের মোট আয়ের মাত্র ১০ শতাংশের মতো—তারা আইসিসির এই ধাক্কা কিছুটা অক্ষতভাবে সইতে পারবে। যেমন, ইসিবি (ECB) গত অর্থবছরে ৩১৯ মিলিয়ন পাউন্ড আয় করেছে, যার মধ্যে মাত্র ৩০ মিলিয়ন পাউন্ড (৯.৪ শতাংশ) এসেছে আইসিসি থেকে।

কিন্তু ‘বিগ থ্রি’র বাইরের দেশগুলোর জন্য এই আর্থিক ক্ষতি হবে পঙ্গু করে দেওয়ার মতো। উইজডেনের বোর্ড সদস্য এবং সাবেক আইসিসি কর্মকর্তা এডওয়ার্ড ফিটজগিবন পর্যবেক্ষণ করেছেন, “আসল ঝুঁকি হলো ‘মধ্যবিত্ত’ এবং উদীয়মান দেশগুলোর জন্য যারা আইসিসির বণ্টনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তাদের ভুলের কোনো অবকাশ আর থাকছে না।”

ফিটজগিবন হিসেব করেছেন প্রতিটি বোর্ড আইসিসির ওপর কতটা নির্ভরশীল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ তাদের আয়ের ৪৪ শতাংশ পায় আইসিসি থেকে। নিউজিল্যান্ড ও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই চিত্র ৫২ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে তা ৬৮ শতাংশ। ক্রিকেটের ৯৬টি সহযোগী দেশের অনেকের আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে আইসিসি থেকে।

তহবিল নাটকীয়ভাবে কমে গেলে দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলোও—যারা বর্তমান বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়ন এবং গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট—বিপাকে পড়বে। আইসিসির টাকা কমলে দলগুলো খেলোয়াড়দের পর্যাপ্ত বেতন দিতে পারবে না, যার ফলে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের টানে তারা আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে চাইবে না বা অকালে অবসর নেবে।

অর্থের সংকটে দলগুলো অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ সুবিধা এবং ঘরোয়া প্রোগ্রামে বিনিয়োগ করতে পারবে না। এছাড়া ইংল্যান্ড ও ভারত বাদে অন্য দলগুলোর বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচ আয়োজনের মতো লোকসানি সূচিগুলো তারা আর বহন করতে পারবে না। দক্ষিণ আফ্রিকা গত বছর লর্ডসে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল জিতলেও গত ঘরোয়া মৌসুমে তারা একটিও টেস্ট খেলেনি।

দেশগুলো এখন আইসিসি থেকে কম সাহায্য পাওয়ার ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছে। ইংল্যান্ড যে ‘দ্য হান্ড্রেড’ তৈরি করেছে, তার প্রধান কারণ ছিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং এমন একটি টুর্নামেন্ট তৈরি করা যা প্রতি বছর নিশ্চিত আয় দেবে। এমনকি উদীয়মান দেশগুলোও বুঝতে পারছে যে তাদের নিজস্ব আয়ের উৎস তৈরি করতে হবে।

নেপাল প্রিমিয়ার লিগ এখন বাণিজ্যিকভাবে সফল; আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও স্কটল্যান্ডকে নিয়ে ‘ইউরোপিয়ান টি-টোয়েন্টি প্রিমিয়ার লিগ’ অবশেষে এ বছর চালু হতে যাচ্ছে। আগামী বছরগুলোতে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ও ভারতের বাইরের দ্বিপাক্ষিক সিরিজগুলো আরও বেশি গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে।

ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এই ভবিষ্যৎ এখন অনিবার্য মনে হচ্ছে। ত্রিশ বছর আগে একটি ভারত-পাকিস্তান সম্মিলিত দল কলম্বোতে ম্যাচ খেলেছিল এটি প্রমাণ করতে যে ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার যৌথ আয়োজনে বিশ্বকাপ নিরাপদ।

ক্রিকেটের সেই ‘এশীয় জোট’ অনেক আগেই ভেঙে গেছে। হয়তো রাজনৈতিক বাস্তববাদিতা থেকে কিছু সম্পর্কের উন্নতি হতে পারে—যেমন ভারত ও বাংলাদেশের ২০৩১ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ যৌথভাবে আয়োজন করার কথা রয়েছে, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে অবিশ্বাস্য মনে হয়। তবে এটা প্রায় নিশ্চিত যে, এই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সূচি বিভ্রাট সামনে আরও বড় বিপর্যয়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে।

বিদ্রুপের বিষয় হলো, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আসল বিজয়ী কোনো আন্তর্জাতিক দল হবে না; বরং বিজয়ী হবে বিশ্বজুড়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি দলগুলোর মালিকরা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট যত বেশি বিশৃঙ্খলার কবলে পড়বে, ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট সম্প্রচারকদের কাছে তত বেশি নিরাপদ এবং লাভজনক বিকল্প হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে।

(ফুটনোট: আইসিসির মধ্যস্ততায় পাকিস্তান ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ খেলতে রাজি হওয়ার আগে এই লেখাটি লিখেন টিম উইগমোর)