দেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে (BCB) পরিবর্তনের হাওয়া বইলেও তা বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকতে পারছে না। আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বাধীন বোর্ড ভেঙে দিয়ে জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের যে অ্যাডহক কমিটি গঠন করেছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি), তা নিয়ে খোদ সংসদ অধিবেশনে প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (NCP) সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। বিসিবির এই নতুন কমিটিকে তিনি ‘বাপের দোয়া ক্রিকেট বোর্ড’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন।
সংসদে উত্তপ্ত বিতর্ক ও হাসনাতের তোপ
আজ কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ সংসদ অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার সময় বিসিবির নতুন কমিটিকে নগ্ন দলীয়করণের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, “আমরা যদি দেখি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে যেভাবে নগ্নভাবে দলীয়করণ করা হচ্ছে, এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক যেভাবে দখল করা হয়েছে, যেভাবে বিসিবিকে দখল করা হয়েছে, তাতে এটি বাপের দোয়া ক্রিকেট বোর্ডে পরিণত হয়েছে।”
হাসনাতের এই বক্তব্যে তাঁর সমমনা সাংসদেরা টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানান। তবে সবচেয়ে আলোচনার বিষয় ছিল সংসদ গ্যালারিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মুচকি হাসি, যা এই বিতর্কে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।
আরও পড়ুন: বিসিবির কমিটি ভাঙার যত কারণ, যে কারণে তামিম ইকবাল দায়িত্বে
কমিটিতে ‘ভিআইপি’ সন্তানদের মেলা
হাসনাতের এই ‘বাপের দোয়া’ মন্তব্যের পেছনে রয়েছে কমিটির সদস্যদের পারিবারিক পরিচয়। ১১ সদস্যের অ্যাডহক কমিটির বেশ কয়েকজনই দেশের বর্তমান শীর্ষস্থানীয় মন্ত্রী ও নেতাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন:
মির্জা ইয়াসির আব্বাস: রাজনৈতিক উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) মির্জা আব্বাসের ছেলে।
সৈয়দ ইব্রাহিম আহমদ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ছেলে।
ইসরাফিল খসরু: অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ছেলে।
রাশনা ইমাম: প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের স্ত্রী।
এই নিয়োগ নিয়ে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলেন, এখানে কোনো ‘বাপের দোয়া বা মায়ের দোয়া’ করা হয়নি। তবে অ্যাডহক কমিটিতে নিজের ছেলের উপস্থিতির বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান।
আরও পড়ুন: তামিমের অঙ্গীকার, তামিমের প্রতিশ্রুতি
আঞ্চলিক আধিপত্য ও গঠনতান্ত্রিক প্রশ্ন
বিতর্কের আরেকটি বড় জায়গা হলো এই কমিটির আঞ্চলিক ভারসাম্য। ১১ সদস্যের মধ্যে সভাপতি তামিম ইকবালসহ ৫ জনই চট্টগ্রামের বাসিন্দা। এছাড়া বিসিবির বর্তমান ২০২৪ সালের সংশোধিত গঠনতন্ত্রে নির্বাচন আয়োজনের জন্য ‘অ্যাডহক কমিটি’ গঠনের কোনো সুনির্দিষ্ট বিধান নেই। ফলে এই কমিটির আইনি বৈধতা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলেছেন ক্রীড়া বিশ্লেষকরা।
বুলবুলের ‘সাংবিধানিক অভ্যুত্থান’ ও আইসিসি ফ্যাক্টর
সর্বশেষ নির্বাচিত সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল এই কমিটিকে ‘অবৈধ’ এবং ‘ভুয়া সত্তা’ (Sham Entity) হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি অভিযোগ করেছেন যে, সরকার দেশের ক্রিকেটীয় স্বায়ত্তশাসনের গলায় ছুরি ধরেছে। ক্রিকেটের অস্থিতিশীলতা কাটাতে তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) দ্রুত হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। যদি আইসিসি একে ‘সরকারি হস্তক্ষেপ’ হিসেবে বিবেচনা করে, তবে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সদস্যপদ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

