অসম বয়সী দুই ক্রিকেট তারকা বুমরাহ ও সূর্যবংশী।অসম বয়সী দুই তারকা বুমরাহ ও সূর্যবংশীর লড়াই উপভোগ করছেন সবাই। ছবি: গেটি

গুয়াহাটির বর্ষাপাড়া স্টেডিয়ামে কালবৈশাখীর দাপটে প্রায় তিন ঘণ্টা অপেক্ষার প্রহর গুনতে হয়েছিল দর্শকদের। ২০ ওভারের IPL ম্যাচ যখন কাটছাঁট করে ১১ ওভারে নামিয়ে আনা হলো, তখন মাঠের কৌশল থেকে শুরু করে দর্শকদের উত্তেজনা—সবই যেন বদলে গেল। তবে গ্যালারিতে উপস্থিত হাজার হাজার ক্রিকেট অনুরাগী আর টিভির পর্দার সামনে থাকা কোটি কোটি মানুষের নজর ছিল কেবল একটি বিশেষ মুহূর্তের দিকে। গত বছর জয়পুরে যে লড়াই দেখার জন্য বিশ্ব অধীর অপেক্ষায় ছিল কিন্তু শুরুতেই শেষ হয়ে গিয়েছিল, ২০২৬ সালের ৭ এপ্রিল সেই মহেন্দ্রক্ষণটি অবশেষে ফিরে এল। বর্তমান বিশ্বের এক নম্বর বোলার জাসপ্রিত বুমরাহ বনাম ১৫ বছরের ‘বিস্ময়’ বালক বৈভব সূর্যবংশী!

ইতিহাসের পুনর্জন্ম: যখন সময় থমকে গিয়েছিল

২০২৫ সালের ১ মে জয়পুরে যখন দীপক চাহারের বলে মাত্র ২ বলে শূন্য রানে ফিরে গিয়েছিলেন বৈভব, তখন ক্রিকেট ভক্তরা একরাশ হতাশা নিয়ে মাঠ ছেড়েছিলেন। বুমরাহর মুখোমুখি হওয়ার আগেই সেই লড়াই শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু গুয়াহাটির এই বৃষ্টিভেজা রাতে ইতিহাস নিজেকে নতুন করে সাজিয়ে নিল।

দ্বিতীয় ওভারে যখন মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স (MI) অধিনায়ক বুমরাহর হাতে বল তুলে দিলেন, তখন স্ট্রাইক প্রান্তে প্রস্তুত রাজস্থান রয়্যালসের (RR) ১৫ বছর বয়সী তুর্কি বৈভব সূর্যবংশী। একদিকে ৩২ বছর ১২২ দিন বয়সী ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকরতম পেসার, অন্যদিকে তাঁর অর্ধেকেরও কম বয়সী এক কিশোর। শুরু হলো এক অসম কিন্তু ধ্রুপদী দ্বৈরথ।

প্রথম বল এবং দর্পচূর্ণ: বুমরাহকে অভ্যর্থনা

স্কোরকার্ডে বুমরাহর নামের পাশে তখন ০-০-০-০, আর বৈভবের নামের পাশেও ০ (০)। বুমরাহর প্রথম বলটি ছিল লেগ-স্টাম্পের ওপর সাধারণ একটি হাফ-ভলি। সচরাচর বুমরাহ এমন লুজ বল করেন না। কিন্তু ১৩১.২ কিমি গতির সেই বলটিতে বৈভব সূর্যবংশী যেন ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যানের মতো দ্রুততা নিয়ে পজিশন নিলেন। কোনো পায়ের কাজ ছাড়াই কেবল রাজকীয় মেজাজে কবজির মোচড়ে লং-অন দিয়ে সীমানার বাইরে আছড়ে ফেললেন। ১৫ বছরের এক কিশোরের কাছে বিশ্বের সেরা বোলারের এমন ‘ট্রিটমেন্ট’ দেখে মাঠের সবাই হতবাক।

আরও পড়ুন: শচীন-কোহলিদের উত্তরসূরি বৈভব সূর্যবংশীর অবিশ্বাস্য উত্থান যেভাবে

পরের বলে বুমরাহ নিজের লেন্থ সংশোধন করেন এবং গতি কমিয়ে বৈভবকে আটকে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু বৈভব অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে বলটি মিডউইকেটে ঠেলে দিয়ে এক রান নিয়ে প্রান্ত বদল করেন। প্রথম দুই বলেই তিনি প্রমাণ করেন, কেবল আক্রমণ নয়, রক্ষণাত্মক ক্রিকেটেও তাঁর সামর্থ্য অসীম।

এ ম্যাচে ১৪ বলে ৩৯ রানের টর্নেডো ইনিংস খেলেন সূর্যবংশী। এক চারের সঙ্গে ছিল ৫ ছক্কা। ম্যাচটি ২৭ রানে জিতে নেয় রাজস্থান রয়্যালস।

ব্র্যাডম্যানের দ্রুততা আর লারার ব্যাক-লিফট

দ্বৈরথের তৃতীয় রাউন্ডে Bumrah ফিরে আসেন তাঁর চিরচেনা বাউন্সারে। পাঁজরের লক্ষ্য করে ধেয়ে আসা সেই শর্ট বলটিতে দমে যাওয়ার বদলে বৈভব দেখালেন কেন তাঁকে ‘ভবিষ্যতের শচীন’ বলা হচ্ছে। ব্রায়ান লারার মতো সেই সুউচ্চ ব্যাক-লিফট আর ব্র্যাডম্যানের মতো বিদ্যুৎগতিতে শট নির্বাচনের ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে তিনি স্কয়ার লেগের ওপর দিয়ে ৭৯ মিটারের একটি বিশাল ছক্কা হাঁকান।

যেকোনো সাধারণ ব্যাটারের জন্য বুমরাহর লেন্থ পড়া যেখানে দুঃস্বপ্ন, সেখানে বুমরাহ বল ছাড়ার আগেই পজিশন নিয়ে ফেলছিলেন Sooryavanshi। বুমরাহ বনাম সূর্যবংশীর এই লড়াইয়ে তিন বলে দুই ছক্কা ছিল কেবল রান সংগ্রহ নয়, বরং বিশ্ব ক্রিকেটে এক নতুন সিংহাসনের দাবিদার আসার স্পষ্ট বার্তা।

আরও পড়ুন: শচীনের রেকর্ড ভাঙছেন সূর্যবংশী? কিন্তু অশ্বিনের ‘অন্য সুর’!

পরিসংখ্যানে সূর্যবংশীর ‘অস্বাভাবিক’ দাপট

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে বৈভব সূর্যবংশীর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে যে কেউ বিচলিত হতে পারেন। এই ম্যাচের আগে ৩৭৮ বলে ৬৮টি ছক্কা মেরেছেন তিনি, অর্থাৎ গড়ে প্রতি ৫.৬ বলে একটি করে ছক্কা! যেখানে ভারতের অন্যতম সেরা বিধ্বংসী ওপেনার যশস্বী জয়সওয়াল প্রতি ১৫.৬ বলে একটি ছক্কা মারেন। ১৩ বছর বয়সে বিহারের হয়ে অভিষেক ম্যাচে ২ ছক্কায় ১৩ রান করা কিশোর এখন বুমরাহর মতো বোলারের দর্পচূর্ণ করে বুঝিয়ে দিচ্ছে সে বিশ্ব শাসন করতেই এসেছে।