ফুটবল মাঠে লামিনে ইয়ামালের পায়ের জাদু যেমন এক অদ্ভুত আনন্দ দেয়, ক্যামেরার সামনেও ১৮ বছর বয়সী এই বার্সেলোনা উইঙ্গারের কথা বলায় ঠিক তেমনই এক সাবলীল ছন্দ রয়েছে। আগামী মাসেই যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার মাটিতে ক্যারিয়ারের প্রথম ফিফা বিশ্বকাপ খেলতে নামবেন স্পেনের এই বিস্ময় বালক। চোটের কারণে প্রথম ম্যাচ মিস করার শঙ্কা থাকলেও, ২০২৬ বিশ্বকাপে স্পেনের মূল চাবিকাঠি ভাবা হচ্ছে তাঁকে। বিশ্বমঞ্চে পা রাখার আগে ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা ‘ফিফা’র মুখোমুখি হয়ে নিজের চাপ, মানসিকতা ও ট্রফি জয়ের স্বপ্ন নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড।
ইয়ামালের সেই আকর্ষণীয় সাক্ষাৎকারটি ক্রিকফুট২৪ডটকম-এর পাঠকদের জন্য নিচে হুবহু তুলে ধরা হলো:
ফিফা: ‘ফিফা বিশ্বকাপ’ শব্দটা শুনলেই আপনার মাথায় প্রথম কী আসে?
লামিনে ইয়ামাল: একদম ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, এটা এমন একটা টুর্নামেন্ট যা পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ দেখে। এটাই বিশ্বকাপকে বিশেষ কিছু করে তোলে। এমনকি আপনি যদি ফুটবল পছন্দ নাও করেন, তাও নিজের দেশ যখন খেলবে, হুট করেই দেখবেন সবাই রাস্তায় নেমে এসেছে, একসঙ্গে খেলা দেখছে।
এটাই ফুটবলের আসল সৌন্দর্য। আমি নিজেই এবার সেই মহোৎসবের অংশ হতে যাচ্ছি ভাবলেই গায়ের পশম খাড়া হয়ে যায়।
ফিফা: এত চাপের মধ্যেও আপনি মাঠে দারুণ স্বাধীনতা নিয়ে খেলেন। এটা কীভাবে সম্ভব করেন?
ইয়ামাল: আমি যদি এমন কোনো কাজ করতাম যা আমি পারি না, তাহলে হয়তো নার্ভাস হতাম।
ধরুন, আমার যদি কোনো সাধারণ চাকরি থাকত—যা আমি কখনো করিনি—তাহলে সব নষ্ট করে ফেলার ভয়ে আমি সারাক্ষণ চিন্তিত থাকতাম। তবে ফুটবল এমন একটা জিনিস যা আমি জীবনের শুরু থেকেই করে আসছি; এটা আমার চেনা জগত। তাই আমি স্রেফ খেলাটা উপভোগ করার চেষ্টা করি। যখন গ্যালারিতে আমার বাবা-মাকে দেখি এবং বুঝি যে তাঁরা আমাকে নিয়ে গর্বিত, তখন সব চাপ উধাও হয়ে যায়। এটা ভীষণ দারুণ একটা অনুভূতি।
আরও পড়ুন:
বিশ্বকাপের শুরুতে লামিনে ইয়ামালকে পাচ্ছে না স্পেন!
ফিফা: স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে সবসময় মুখে হাসি নিয়ে খেলার কথা বলেন। আপনার কাছে এটার গুরুত্ব কেমন?
ইয়ামাল: আমার পুরো খেলাটাই আসলে নির্ভর করে ক্রিয়েটিভিটি বা সৃজনশীলতার ওপর। যখন আমি খেলাটা উপভোগ করতে পারি না, তখন পারফরম্যান্সও মার খায়। সবকিছু তখন খুব ম্যাড়মেড়ে আর অনুপ্রেরণাহীন মনে হয়। কিন্তু ইউরোর দিনগুলোর মতো যখন আমি মনের দিক থেকে খুশি থাকি, তখন মাঠের সবকিছু নিজে থেকেই ক্লিক করে এবং আমি অনেক স্বাধীনভাবে খেলতে পারি।
ফিফা: আর যখন আপনি আপনার সেরা ফর্মে থাকেন?
ইয়ামাল: আমি সবসময় বলি, সেরা ফর্মে থাকা মানে নিজেকে একজন ‘সুপারহিরো’ মনে হওয়া—তখন সব কিছু একদম নিখুঁতভাবে জায়গামতো বসে যায়। আমি আরও দ্রুত দৌড়াতে পারি, নিজেকে শক্তিশালী মনে হয় এবং শরীরে অ্যাড্রেনালিন রাশ অনুভব করি। তখন মনে হয় কেউ আমাকে থামাতে পারবে না। বিশ্বকাপের মঞ্চেও আমি ঠিক এই লেভেলে পৌঁছাতে চাই।
ফিফা: ইউরো এবং নেশনস লিগ জেতার পর এবার স্পেনকে বিশ্বকাপের হট ফেভারিট ধরা হচ্ছে। এই চাপটা কীভাবে সামলাচ্ছেন?
ইয়ামাল: ব্যাপারটা বেশ মজার, কারণ ইউরোর সময় সমীকরণটা ঠিক উল্টো ছিল। কেউই আমাদের চ্যাম্পিয়ন ভাবেনি, আর সেটাই আমাদের পক্ষে কাজ করেছিল। পাশাপাশি মাঠে নামার পর আপনি ফেভারিট কি না, তা কোনো কাজে আসে না। এটা আপনাকে কোনো বাড়তি সুবিধা দেবে না বা গোল করতেও সাহায্য করবে না। আপনাকে ম্যাচ বাই ম্যাচ এগোতে হবে। বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, পর্তুগাল, ইংল্যান্ডের মতো অনেক শক্তিশালী দল আছে এবং সবাই তাদের সেরাটা দিয়েই আসে। আমাদের লক্ষ্য হলো স্পেনের জন্য নিজেদের উজার করে দেওয়া এবং নিজেদের খেলার ওপর বিশ্বাস রাখা। কারণ, আমার মতে আমরাই সবচেয়ে সুন্দর ফুটবল খেলি।
আরও পড়ুন:
২০২৬ বিশ্বকাপ কাঁপাতে পারেন ইয়ামাল-এস্তেভাওসহ ১০ বিস্ময় বালক
ফিফা: আপনার চোখে স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি কোনটি?
ইয়ামাল: অবশ্যই আমাদের খেলোয়াড়রা। স্প্যানিশ একাডেমিগুলো বিশ্বের সেরা এবং তারা প্রতিনিয়ত টপ ট্যালেন্ট তৈরি করছে, যা আমাদের খেলার ধরনেই স্পষ্ট। অবশ্য বিশ্বকাপ শুধু ভালো খেলার জায়গা নয়, এখানে জিততে হবে। তবে আমরা আমাদের দর্শনে বিশ্বাস করি এবং এর সুফলও পাচ্ছি।
ফিফা: আপনাকে কোনটি বেশি অনুপ্রাণিত করে—মানুষের ধারণাকে সত্যি প্রমাণ করা, নাকি তাদের ভুল প্রমাণ করা?
ইয়ামাল: আমি বলব মানুষের সমালোচনাকে ভুল প্রমাণ করা। আপনি যখন খুব অল্প বয়সে পাদপ্রদীপে চলে আসবেন, তখন আপনাকে নিয়ে সবসময় সন্দেহ তৈরি হবে—লোকে বলবে ও বড্ড ছোট, ও কেবল এক মৌসুমের বিস্ময়, কিংবা ওকে অতিরিক্ত মূল্যায়ন করা হচ্ছে। আমার কাজ হলো প্রতি ম্যাচে নিজের সামর্থ্য দেখিয়ে তাদের মুখ বন্ধ করা।
বিশ্বকাপ আমার জন্য নতুন একটা পরীক্ষা এবং আমি এটার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।
ফিফা: মানুষ প্রায়ই আপনার সাথে মেসি, রোনালদো, এমবাপ্পে বা নেইমারের তুলনা করে। আপনি কি নিজেকে ওই উচ্চতায় দেখেন?
ইয়ামাল: আমার লক্ষ্য তাদের সাথে নিজের তুলনা করা নয়; বরং তাদের পাশে নিজের নামটা লেখানো। যাতে পরের বার যখন আপনি কাউকে এই প্রশ্নটা করবেন, তখন সেই তালিকায় যেন আমার নামটাও উচ্চারিত হয়।
ফিফা: অর্থাৎ আপনি নিজের একটা আলাদা পরিচয় তৈরি করতে চান?
ইয়ামাল: একদমই তাই! আমি মনে করি এটাই আসল চাবিকাঠি। আপনি যদি অন্য কারও সাথে নিজের তুলনা করতে গিয়ে আটকে যান, তবে নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারবেন। আমি নিজের পথ নিজে তৈরি করতে চাই, খেলাটা উপভোগ করতে চাই এবং মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চাই। আর যখন আমি ফুটবলকে বিদায় জানাব, তখনও মানুষ যেন আমার পুরোনো খেলার ভিডিওগুলো দেখে আনন্দ পায়।
ফিফা: আপনার ছোটবেলার সংস্করণকে যদি কোনো উপদেশ দিতে বলা হয়, কী বলবেন?
ইয়ামাল: (হেসে) নিজেকে বলব, বাচ্চা হিসেবে সময়টা উপভোগ করো, কারণ তুমি নিজে মাঠে নামার আগে তোমাকে আরও দুটি বিশ্বকাপ দর্শক হিসেবে টিভিতে দেখতে হবে! এই মুহূর্তটার স্বাদ নাও, কোনো কিছু অতিরিক্ত না ভেবে স্রেফ খেলে যাওয়ার অনুভূতিটা মনে রাখো এবং বিশ্বকাপের মঞ্চে স্পেনের হয়ে গোল করার স্বপ্ন দেখ। এই অনুভূতিটা ধরে রাখো এবং বিশ্বাস করো যে তুমি একদিন এটা সত্যি করে দেখাবে। স্বপ্ন দেখা কখনো বন্ধ করো না।
ফিফা: আপনার সতীর্থ গাভির পর স্পেনের ইতিহাসের দ্বিতীয় কনিষ্ঠতম বিশ্বকাপ গোলদাতা হওয়ার সুযোগ আছে আপনার সামনে। এটা কেমন অনুভূতি হবে?
ইয়ামাল: ইউরো জেতার পর থেকেই গাভি আমাকে খেপিয়ে মজা করে বলে যে, এটাই নাকি একমাত্র রেকর্ড যা আমি তাঁর কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারব না। তাই আমাকে আরও এক ধাপ উঁচুতে যেতে হবে—বিশ্বকাপের ইতিহাসে স্পেনের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে হ্যাটট্রিক করতে হবে। যদি আমি ম্যাচে দ্বিতীয় গোলটি পেয়ে যাই, তবে গাভির দিকে তাকিয়ে একটা ইশারা করব, কারণ ওর তো মোটে একটা গোল! আমি তিনটার জন্যই ঝাঁপাব।
ফিফা: স্পেনকে কি এবার ট্রফি উঁচিয়ে ধরতে দেখছেন?
ইয়ামাল: আমি আশা করি। এটা আমার জন্য একটা স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো ব্যাপার হবে।
ফিফা: সেই স্বপ্নের দৃশ্যটা কেমন হবে?
ইয়ামাল: রেফারি শেষ বাঁশি বাজাবেন এবং আমরা জিতে যাব। স্কোরলাইন কত হবে জানি না, কিন্তু দিনশেষে আমরাই চ্যাম্পিয়ন। তারপর স্পেনে ফিরে কোটি কোটি ভক্তদের সাথে সেই ট্রফি উদযাপন করা—দৃশ্যটা সত্যিই স্পেশাল হবে।
আরও পড়ুন:
‘বিশ্বমঞ্চে রাজত্ব করতে ইয়ামালকে বার্সা ছাড়তে হবে’

