অ্যানফিল্ডের গ্যালারিতে আর শোনা যাবে না ‘ইজিপশিয়ান কিং’ গানটি। দীর্ঘ ৯ বছরের অবিশ্বাস্য যাত্রার পর লিভারপুল ছাড়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিলেন মোহাম্মদ সালাহ। ২০২৬ মৌসুম শেষে ফ্রি ট্রান্সফারে ক্লাব ছাড়বেন তিনি। ২০১৭ সালে এএস রোমা থেকে যোগ দেওয়ার পর লিভারপুলের হয়ে সম্ভাব্য সব শিরোপা জেতা এই ৩৩ বছর বয়সী তারকা তাঁর বিদায়কে অভিহিত করেছেন ‘বিদায়ের প্রথম পর্ব’ হিসেবে।
পরিসংখ্যানের জাদুকর: শুধুই কি গোল?
লিভারপুলের জার্সিতে ৪৩৫ ম্যাচে ২৫৫ গোল—সালাহর এই পরিসংখ্যান তাঁকে ক্লাবের ইতিহাসের তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসিয়েছে। ২০১৭ সালের পর প্রিমিয়ার লিগে তাঁর চেয়ে বেশি গোল (১৮৯) বা অ্যাসিস্ট (৯২) আর কেউ করতে পারেনি।
চারটি গোল্ডেন বুট এবং তিনবার পিএফএ প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার জয়ী এই ফুটবলারকে নিয়ে একটি প্রচলিত রসিকতা আছে—“সালাহ ম্যান অব দ্য ম্যাচ অ্যাওয়ার্ড এমনভাবে সংগ্রহ করেন যেন সেটি কোনো ভেন্ডিং মেশিন থেকে বের হওয়া সাধারণ কিছু!”
স্বপ্নের ফাটল: কেন এই প্রস্থান?
অথচ বিদায়টা এমন হওয়ার কথা ছিল না। গত বছরই ২০২৭ সাল পর্যন্ত চুক্তি নবায়ন করেছিলেন সালাহ। কিন্তু নতুন কোচ আর্নে স্লটের অধীনে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে থাকে। গত ডিসেম্বরে লিডসের বিপক্ষে ৩-৩ ড্র হওয়া ম্যাচের পর এক বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারে সালাহ অভিযোগ করেন, “ক্লাবের কেউ একজন আমাকে সবকিছুর জন্য দায়ী করতে চাইছে এবং আমার ওপর দোষ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।”
সালাহর ঘনিষ্ঠদের মতে, তিক্ততার শুরু গত অক্টোবরে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে আইন্ট্রাখট ফ্রাঙ্কফুর্টের বিপক্ষে ম্যাচে তাঁকে বেঞ্চে রাখার পর থেকে। সালাহ মনে করতেন, ক্লাবের হয়ে তাঁর যা অর্জন, তাতে তিনি প্রতিটি বড় ম্যাচে শুরুর একাদশে থাকার যোগ্য। কিন্তু স্লট ভিন্ন পথে হাঁটতে শুরু করেন।
আরও পড়ুন: লিভারপুলে মোহাম্মদ সালাহর ‘লং গুডবাই’ কি শুরু?
নতুন আক্রমণভাগ ও সালাহর অভিমান
লিভারপুল গত গ্রীষ্মে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করে আলেকজান্ডার ইসাক, ফ্লোরিয়ান উইর্টজ এবং হুগো একিটিকের মতো তরুণদের দলে ভেড়ায়। এই বড় বিনিয়োগ থেকেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, ক্লাবের আক্রমণভাগে সালাহ আর ‘অপরিহার্য’ নন।
স্পোর্টিং ডিরেক্টর রিচার্ড হিউজের সাথে বৈঠকেও সালাহকে আভাস দেওয়া হয়েছিল যে তাঁকে নিয়মিত বেঞ্চে বসতে হতে পারে। এই অভিমান আর সম্মানের অভাব থেকেই সালাহ ক্লাব ছাড়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।
বিদায়বেলায় মিশরীয় রাজা
সালাহ তাঁর সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, “আমি কখনোই ভাবিনি এই ক্লাব, এই শহর এবং এখানকার মানুষ আমার জীবনের এত গভীরে মিশে যাবে। লিভারপুল শুধু একটি ফুটবল ক্লাব নয়, এটি একটি আত্মা।”
সালাহর এজেন্ট রামি আব্বাস জানিয়েছেন, সালাহ পরবর্তী মৌসুমে কোথায় খেলবেন তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে ভক্তদের সম্মানে সালাহ চেয়েছিলেন ক্লাব যেন মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই এটি ঘোষণা করে দেয়, যাতে তিনি মাথা উঁচু করে অ্যানফিল্ড থেকে বিদায় নিতে পারেন।
মাঠে গোল করার পর সালাহর সেই সিজদাহ দেওয়ার দৃশ্য লিভারপুল ভক্তরা সারাজীবন মনে রাখবে। ১৫টি ম্যাচ পরেই হয়তো সালাহর লাল জার্সিটি মিউজিয়ামে চলে যাবে, কিন্তু লিভারপুলের ইতিহাসে ‘মিশরীয় রাজা’র রাজত্ব টিকে থাকবে চিরকাল।

