আহমেদাবাদের ফাইনালে যখন ভারতের জয় নিশ্চিত হলো, তখন গ্যালারিতে শুধু একটিই নাম প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল—সঞ্জু স্যামসন। অথচ এই বিশ্বকাপ শুরুর আগে স্যামসনকে নিয়ে কারো খুব একটা প্রত্যাশা ছিল না। পরিস্থিতির ফেরে একাদশে সুযোগ পাওয়া সেই স্যামসনই টুর্নামেন্ট শেষ করলেন ৩২১ রান নিয়ে, যার স্ট্রাইক রেট ছিল ১৯৯-এর উপরে! নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ফাইনালে ৮৯ রানের ঝলমলে ইনিংস খেলে তিনি প্রমাণ করেছেন, ধৈর্য আর পরিশ্রম কখনো বৃথা যায় না।
এক দশকের লড়াই ও নীরব সাধনা
২০১৫ সালে অভিষেকের পর থেকে স্যামসনের ক্যারিয়ার ছিল রোলার কোস্টারের মতো। আইপিএলে রাজস্থান রয়্যালসের হয়ে নিয়মিত পারফর্ম করলেও জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তাঁর ব্যাটে রান আসছিল না। প্রথম ২৩ ইনিংসে ফিফটি ছিল মাত্র একটি। কিন্তু ৩১ বছর বয়সে এসে ঘরোয়া ক্রিকেটের কঠোর পরিশ্রম আর ধৈর্যের ফল পেলেন তিনি। রিঙ্কু সিং পারিবারিক কারণে দল থেকে ছুটি না নিলে হয়তো স্যামসনের এই সুযোগটাই আসত না। কিন্তু নিয়তি তাঁর জন্য লিখে রেখেছিল বড় কিছু।
ফিটনেস ও ধ্রুপদী ব্যাটিংয়ের মেলবন্ধন
আজকালকার তরুণদের মতো সিক্স-প্যাক অ্যাবস বা গ্ল্যামারের পেছনে ছোটেননি স্যামসন। তাঁর শক্তি লুকিয়ে ছিল তাঁর সাধারণ জীবনযাপন এবং ধ্রুপদী ব্যাটিং শৈলীতে। নিখুঁত ফুটওয়ার্ক এবং টাইমিংয়ের ওপর ভর করে তিনি এমন সব শট খেলেছেন, যা দেখে মুগ্ধ হয়েছেন ক্রিকেট ব্যাকরণবিদরা। কোয়ার্টার ফাইনাল সমতুল্য ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তাঁর অপরাজিত ৯৭ রানের ইনিংসটিই মূলত ভারতের ফাইনালের পথ প্রশস্ত করেছিল।
বিনয় ও টিম স্পিরিট
ফাইনালে ৮৯ রান করলেও ম্যাচসেরার পুরস্কারটি উঠেছে জাসপ্রিত বুমরাহর হাতে। সেমিফাইনালেও একই কাণ্ড ঘটেছিল। তখন স্যামসন নিজেই বলেছিলেন, “এই পুরস্কার আসলে বুমরাহর প্রাপ্য। সে যদি ডেথ ওভারে ওভাবে বল না করত, তবে আমি এখানে দাঁড়িয়ে থাকতাম না।” এই বিনয়ই স্যামসনকে অন্য সবার চেয়ে আলাদা করেছে।
এক নতুন উত্তরাধিকার
২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপটি কেবল ভারতের শিরোপা রক্ষার আসর ছিল না, এটি ছিল সঞ্জু স্যামসনের নিজেকে প্রমাণের মঞ্চ। হাই-রিস্ক ব্যাটিংয়ের যুগে স্যামসন এখন এক ‘ফোক হিরো’, যিনি ব্যক্তিগত মাইলফলকের চেয়ে দলের ওপর নিজের প্রভাব রাখাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। ক্রিকেটের ঈশ্বর অবশেষে তাঁর ধৈর্যের প্রতিদান দিলেন—সঞ্জু স্যামসন এখন এক বিশ্বজয়ী বীর।

