বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) অন্তর্বর্তীকালীন সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছেন সাবেক সফল অধিনায়ক তামিম ইকবাল। ইএসপিএন ক্রিকইনফোকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি মাঠের ক্রিকেট, নারী ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা, দর্শকদের সুযোগ-সুবিধা এবং বোর্ডের ভবিষ্যৎ নির্বাচন নিয়ে নিজের খোলামেলা পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো:
প্রশ্ন: দলের অধিনায়ক আর বোর্ডের সভাপতি হওয়ার মধ্যে পার্থক্য কতটা?
তামিম ইকবাল: পার্থক্যটা আকাশ-পাতাল। অধিনায়ক হিসেবে আপনার চিন্তা থাকে শুধু মাঠের ক্রিকেট আর খেলোয়াড়দের নিয়ে। কিন্তু সভাপতি হিসেবে আপনাকে সামগ্রিক উন্নয়নের কথা ভাবতে হয়—খেলোয়াড় থেকে শুরু করে কোচিং স্টাফ এবং বোর্ডের প্রতিটি কর্মচারী।
এখানে আপনি আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না; প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে হয় দেশের ক্রিকেটের বৃহত্তর স্বার্থে এবং ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে।
প্রশ্ন: অধিনায়কত্বের অভিজ্ঞতা কি এখানে কোনো কাজে দিচ্ছে?
তামিম: অবশ্যই। আধুনিক ক্রিকেটাররা কী পছন্দ করে বা তাদের চাওয়া-পাওয়া কী, সেটা আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। ড্রেসিংরুমে বসে আমরা বোর্ড সম্পর্কে কী আলোচনা করতাম, সেটা আমার মনে আছে। খেলোয়াড় এবং বোর্ডের মধ্যে যে মানসিক দূরত্ব ছিল, আমি সেটা ঘোচাতে চাই।
যদিও নির্বাচনের খুব বেশি দেরি নেই, তাই হাতে সময় কম। বড় বিনিয়োগের পাশাপাশি ছোট ছোট কিছু পরিবর্তন এনেও মানুষের মনে আশা জাগানো সম্ভব।
আরও পড়ুন: বুলবুলের সিদ্ধান্ত বদলে দিলেন তামিম ইকবাল!
প্রশ্ন: আপনি বর্তমান সময়ের অন্যতম কনিষ্ঠ বোর্ড সভাপতি। আইসিসি বা অন্য বোর্ডগুলোর সাথে আপনার যোগাযোগ কেমন হবে?
তামিম: আমি স্বচ্ছ যোগাযোগে বিশ্বাসী। অংশীদারদের সাথে ডিল করার সময় যৌক্তিক হওয়া প্রয়োজন। আমি যদি বাংলাদেশ ক্রিকেটের লক্ষ্যটা সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পারি, তবে অন্য বোর্ডগুলোও তা ইতিবাচকভাবে নেবে। আমি ক্রিকেটকে একটি বড় পরিবার হিসেবে দেখি, যেখানে বড়রা ছোটদের বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দেয়।
প্রশ্ন: দায়িত্ব নেওয়ার পর আপনি দর্শকদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কথা বলেছিলেন। এ নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?
তামিম: দর্শকরাই আমাদের সবচেয়ে বড় স্টেকহোল্ডার। কিন্তু আমরা তাদের কী দিচ্ছি? যে লোক ২০০ টাকায় টিকিট কাটে, সে ২৫০ টাকা দিয়ে বিরিয়ানি খাবে কীভাবে? আমি আন্তর্জাতিক ম্যাচ চলাকালীন সবার জন্য বিনামূল্যে বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা করতে চাই।
মিরপুর স্টেডিয়ামের সংস্কার নিয়ে কথা বললে বলতে হয়, এখানকার টয়লেটগুলোর যে অবস্থা, তাতে কোনো অভিভাবক কি তাঁর সন্তানকে সেখানে নিয়ে যেতে চাইবেন? দল কেমন ব্যাটিং-বোলিং করবে তা আমার হাতে নেই, কিন্তু মাঠে এসে একজন দর্শক যেন স্বস্তিতে খেলা দেখতে পারেন, তা নিশ্চিত করা আমার দায়িত্ব।
প্রশ্ন: আপনি কি শুধু অন্তর্বর্তীকালীন সভাপতি হিসেবেই থাকতে চান, নাকি ভবিষ্যৎ নিয়ে অন্য কিছু ভাবছেন?
তামিম: আমি প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই পরিষ্কার করেছি যে, পরবর্তী নির্বাচনে আমি সভাপতি পদে লড়ব। আমার দায়িত্ব হলো একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা। স্টেকহোল্ডাররা এটি পাওয়ার যোগ্য। এরপর যদি সুযোগ পাই, তবে আমার ভিশন অনুযায়ী কাজ করব।
পাইপলাইনে ক্রিকেটার তৈরি করা থেকে শুরু করে ম্যাচের সংখ্যা বাড়ানো এবং গ্রামে-গঞ্জে ক্রিকেটের প্রচারণা চালানো—সবই আমার পরিকল্পনায় আছে।
প্রশ্ন: নারী ক্রিকেটের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিয়ে আপনার ভাবনা কী?
তামিম: নারী ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আমার এক নম্বর অগ্রাধিকার। অতীতে যা ঘটেছে (সাবেক নির্বাচকের বিরুদ্ধে অশোভন আচরণের অভিযোগ), তা থেকে শিক্ষা নিয়ে তাঁদের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একজন বাবা-মা তাঁর মেয়ের রান বা উইকেটের চেয়ে তাঁর ভালো থাকা এবং নিরাপত্তা নিয়ে বেশি চিন্তিত থাকেন। বিসিবি প্রধান হিসেবে আমার কাজ হলো সেই আস্থার জায়গা তৈরি করা।
প্রশ্ন: দলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বা সিলেকশনে আপনি কতটা হস্তক্ষেপ করবেন?
তামিম: আমি পেশাদারিত্বে বিশ্বাস করি। আমি দীর্ঘদিন ক্রিকেট খেলেছি, তাই কী ঘটছে সে সম্পর্কে আমার ধারণা আছে। কিন্তু বারবার আইডিয়া দেওয়া বা চাপিয়ে দেওয়া দলের জন্য ভালো নয়। নির্বাচকদের কাজের স্বাধীনতা দিতে হবে।
আমি যদি সব বিষয়ে ডিক্টেট করা শুরু করি এবং দল খারাপ করে, তবে জবাবদিহিতা কার কাছে থাকবে? আমি শুধু পর্যবেক্ষণ করব, কিন্তু তাঁদের ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি করব না।
প্রশ্ন: ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা আবার ফিরিয়ে আনতে আপনার পরিকল্পনা কী?
তামিম: পাঁচজন জনপ্রিয় ক্রিকেটারের ক্যারিয়ার যখন শেষ দিকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই একটা শূন্যতা তৈরি হয়। এখানেই প্রচারণার গুরুত্ব। আমাদের কাজ হলো এই প্রজন্মের ক্রিকেটারদের শিশুদের কাছে ‘হিরো’ হিসেবে উপস্থাপন করা। মিডিয়ার সামনে গিয়ে তাঁদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করলে ব্র্যান্ড হিসেবে ক্রিকেটের ক্ষতিই হবে।
আরও পড়ুন: তামিমকে ধন্যবাদ, নাঈম দুর্ভাগা: রাজিন সালেহ
প্রশ্ন: বিসিবি নির্বাচন কত দূরে?
তামিম: আমাদের তিন মাস সময় দেওয়া হয়েছে, তবে আমি আশাবাদী তিন মাসের আগেই নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
প্রশ্ন: সবাইকে একসাথে নিয়ে চলার চ্যালেঞ্জটা কীভাবে দেখছেন?
তামিম: এই উপমহাদেশে তরুণ নেতৃত্ব মেনে নেওয়া অনেকের জন্য কঠিন হতে পারে। তবে সবার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এবং সঠিক যোগাযোগের মাধ্যমে আমি বিশ্বাস অর্জন করতে চাই। সভাপতির চেয়ারে বসে অহংকার বা রাগের কোনো জায়গা নেই। আমি এখানে কাউকে ডিক্টেট করতে আসিনি, বরং সবাইকে সম্মান দিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে চাই।

