বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের ইতিহাসে ২০১৭ সালটি ছিল এক কলঙ্কিত অধ্যায়। ঢাকার দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেট লিগে আম্পায়ারদের নজিরবিহীন পক্ষপাতিত্বের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে ‘বলি’ হয়েছিলেন দুই তরুণ বোলার—সুজন মাহমুদ ও তাসনিম হাসান। ৪ বলে ৯২ এবং ১.১ ওভারে ৬৯ রান দেওয়ার সেই ঘটনায় বিশ্ব ক্রিকেটে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল। যার ফলে বিসিবি তাঁদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল ১০ বছরের দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা। আজ প্রায় ৯ বছর পর, বিসিবি অ্যাডহক কমিটির বর্তমান সভাপতি তামিম ইকবাল সেই দুই বোলারকে ডেকে পাঠিয়ে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে ‘প্রতিবাদ’
২০১৭ সালের ১১ এপ্রিল সিটি ক্লাব মাঠে লালমাটিয়া ক্লাব খেলছিল অ্যাক্সিওম ক্রিকেটার্সের বিপক্ষে। সুজন মাহমুদ ছিলেন লালমাটিয়ার বোলার। অভিযোগ ছিল, তৎকালীন বিসিবির প্রভাবশালী এক পরিচালকের মালিকানাধীন ক্লাব অ্যাক্সিওমকে জেতাতে আম্পায়াররা নীতিহীনভাবে পক্ষপাতিত্ব করছিলেন।
প্রতিবাদ হিসেবে সুজন ৬৫টি ওয়াইড ও ৩টি নো বল করে মাত্র ৪টি বৈধ বলে ৯২ রান দিয়ে ম্যাচ শেষ করে দেন।
একইভাবে ফিয়ার ফাইটার্সের বোলার তাসনিম ১ ওভার ১ বলে (৭ বল) ৬৯ রান দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।
সেই সময় বিসিবি এই দুই বোলারকে ১০ বছর এবং ক্লাব দুটিকে আজীবন নিষিদ্ধ করে। লঘু পাপে গুরুদণ্ডের এই নজির নিয়ে তখন থেকেই ক্রিকেট পাড়ায় ক্ষোভ ছিল।
অথচ যাদের পক্ষপাতিত্বের কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, সেই আম্পায়ারদের শাস্তি দেওয়া হয়েছিল মাত্র ৬ মাসের নিষেধাজ্ঞা।
আরও পড়ুন:
তামিমকে ছাড়িয়ে রেকর্ড গড়ে শীর্ষে মুশফিক
তামিমের তলব: নেপথ্যে কী?
বিসিবির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, আজ বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল বোলার সুজন ও তাসনিমকে ব্যক্তিগতভাবে ডেকে পাঠান। তিনি দীর্ঘ সময় তাঁদের সাথে কথা বলেন এবং সেই দিন ঠিক কী ঘটেছিল, তা বিস্তারিত জানার চেষ্টা করেন।
মূলত তামিম ইকবালের নেতৃত্বাধীন বর্তমান অ্যাডহক কমিটি ঘরোয়া ক্রিকেটের পুরনো জঞ্জাল পরিষ্কার করতে বদ্ধপরিকর।
অভিযোগ উঠেছে, তৎকালীন বিসিবি কর্তারা আম্পায়ারিংয়ের দুর্নীতি ঢাকার জন্য বোলারদের ওপর দায় চাপিয়ে তাঁদের ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। তামিম জানার চেষ্টা করেছেন, কার নির্দেশে কিংবা কোন পরিস্থিতির শিকার হয়ে তাঁরা এমন আত্মঘাতী পথ বেছে নিয়েছিলেন।
ক্রিকেটে ফিরছেন কি সুজন-তাসনিম?
১০ বছরের নিষেধাজ্ঞার প্রায় ৯ বছর কাটিয়ে ফেলেছেন এই দুই ক্রিকেটার। তাঁদের সোনালী সময় এখন শেষের দিকে।
তবে বিসিবি সূত্র জানাচ্ছে, তামিম ইকবাল এই দুই বোলারকে ‘পুনর্বাসন’ করার বিষয়ে গুরুত্বের সাথে ভাবছেন। যদি প্রমাণিত হয় যে তাঁরা কেবল অবিচারের শিকার হয়েই প্রতিবাদী হয়েছিলেন, তবে তাঁদের ওপর থেকে কলঙ্কজনক তকমা সরিয়ে ক্রিকেটের মূলধারায় ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, তামিম ইকবালের এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে ‘পেশীশক্তি’ ও ‘আম্পায়ার সিন্ডিকেট’ ভাঙার একটি বড় বার্তা।
গত ৭ এপ্রিল দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তামিম ক্রিকেটে স্বচ্ছতা ফেরানোর কথা বলে আসছেন। সুজন ও তাসনিমকে ডাকার মাধ্যমে তিনি আসলে সেই পুরনো ক্ষতগুলোতে প্রলেপ দিতে চাইছেন, যা দীর্ঘ সময় ধরে অবহেলিত ছিল।
২০১৭ সালের সেই ‘৪ বলে ৯২’ রান এখন আর কেবল হাসির খোরাক নয়, বরং বাংলাদেশের ক্রিকেটে সিস্টেমিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক করুণ প্রতিবাদের স্মারক। তামিম ইকবালের এই হস্তক্ষেপে সেই দুই বোলার শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার পান কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
আরও পড়ুন:
বিসিবিতে আমি আনন্দ করতে আসিনি: তামিম ইকবালের হুংকার

