ইউরোপের আঙিনায় সান মারিনোকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে অভিষেকটা দুর্দান্তভাবে রাঙিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের নতুন প্রধান কোচ থমাস ডুলি। এই জার্মান-আমেরিকান কোচের অধীনে লাল-সবুজের প্রতিনিধিবৃন্দ এক ঐতিহাসিক জয় দিয়ে শুরু করেছে। তবে এই স্মরণীয় জয়ের পরও আত্মতৃপ্তিতে ভুগছেন না নতুন কোচ। ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে দলের ঐতিহাসিক জয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করার পাশাপাশি নিজের চেনা বাস্তববাদী রূপেই ধরা দিলেন ডুলি। দলের খামতি ও শক্তির জায়গাগুলো নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি। সঙ্গে হামজাকে নিয়ে করেছেন ভূয়সী প্রশংসা।
ইউরোপীয় কন্ডিশন ও প্রতিপক্ষের শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে ডুলির মনে কিছুটা শঙ্কা ছিল।
ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, “ম্যাচের ফলাফলে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের ২২, ৪২, ৩৭ কিংবা ৭৬ নম্বর দলগুলোর বিপক্ষে সান মারিনোর সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বেশ ভালো ছিল। তাই এই ম্যাচটি নিয়ে আমি কিছুটা শঙ্কিত ছিলাম। ইউরোপের দলগুলো মূলত এরিয়াল বল বা বাতাসে দারুণ খেলে এবং ওদের শারীরিক লড়াই চমৎকার। স্বাভাবিকভাবেই এশিয়ান দল হিসেবে আমাদের এই জায়গায় কিছুটা খামতি রয়েছে। তবে আমাদের প্লাস পয়েন্ট ছিল গতি। আমরা পাসিং ফুটবল, মাঠের ফাঁকা জায়গা ব্যবহার এবং সুযোগ পেলেই বল জালে জড়ানোর কৌশলে খেলেছি।”
শুরুর জড়তা ও প্রস্তুতির অভাব
ম্যাচের প্রথম ১০ থেকে ১৫ মিনিট বাংলাদেশ দল নিজেদের চেনা ছন্দে খুঁজে পায়নি।
এই শুরুর জড়তা নিয়ে ডুলির পর্যবেক্ষণ, “ম্যাচে আপনি কীভাবে শুরু করছেন সেটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম ৫-১০ মিনিট আমরা কিছুটা ভুগেছি। তবে ভিন্ন দেশ, ভিন্ন কন্ডিশন আর সম্পূর্ণ আলাদা শৈলীর ফুটবলের সাথে মানিয়ে নিতে একটু সময় লাগাটাই স্বাভাবিক। প্রথমার্ধের ১৫ মিনিট পর আমরা গতি ব্যবহার করে কিছু ভালো সুযোগ তৈরি করি। সামগ্রিকভাবে ছেলেদের পারফরম্যান্সে আমি সন্তুষ্ট। দ্বিতীয়র্ধে আমরা আরও নিখুঁত ফুটবল খেলেছি।”
এই ম্যাচের আগে বাংলাদেশ দলকে মাত্র এক সপ্তাহ অনুশীলন করানোর সুযোগ পেয়েছেন ডুলি।
ডুলি বলেন, “রক্ষণভাগ থেকে খেলার সময় যারা সবচেয়ে বেশি ভুল পাস বা বল হারিয়েছে, তারা মূলত শেষ দুই দিনে স্কোয়াডে যোগ দেওয়া খেলোয়াড়। আমরা অনুশীলনে আগে কী কৌশল নিয়ে কাজ করেছি, সে সম্পর্কে তাদের পরিষ্কার ধারণা ছিল না। তবে অল্প সময়ের প্রস্তুতি হলেও আমি ছেলেদের ওপর বিশ্বাস রেখেছিলাম।”
ডুলির চোখে দলের দুর্বলতা
ম্যাচ জিতলেও বাংলাদেশের পুরোনো এক রোগ ডুলির চোখে স্পষ্ট ধরা পড়েছে, আর তা হলো ফিনিশিংয়ের অভাব।
নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে ডুলি বলেন, “আমাদের প্রধান দুর্বলতা হলো গোল করার জন্য আমাদের এখনও প্রচুর সুযোগের প্রয়োজন হয়। এছাড়া মাঝে মাঝে আমাদের ফার্স্ট টাচ বা বল রিসিভিং ঠিকঠাক হয় না। আমি দলের সঙ্গে একদম বেসিক বিষয়গুলো—যেমন পাসিং এবং রিসিভিং নিখুঁত করার জন্য কাজ শুরু করেছি। রক্ষণভাগ থেকে বল নিয়ে ওপরে ওঠার সময় আমরা কিছু সহজ বল প্রতিপক্ষকে উপহার দিয়েছি, যা আন্তর্জাতিক ফুটবলে একেবারেই কাম্য নয়।”
হামজা চৌধুরীকে নিয়ে কোচের বড় সার্টিফিকেট
লাল-সবুজের জার্সিতে অভিষেক হওয়া প্রিমিয়ার লিগের তারকা হামজা চৌধুরীকে নিয়ে প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন ডুলি।
ইংল্যান্ডে খেলা এই মিডফিল্ডারকে দলের আসল চালিকাশক্তি উল্লেখ করে ডুলি বলেন, “আমার মতে হামজাই আমাদের সেরা খেলোয়াড়। মাঠের যেকোনো পজিশন থেকেই তাকে পাস দিয়ে খেলা তৈরি করা যায়। বল পায়ে সে দারুণ শক্তিশালী, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং টেকনিক্যালিও অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে—আর এই কারণেই সে ইংল্যান্ডের উচ্চপর্যায়ে খেলে। সে একজন লিডার ও সত্যিকারের টপ-ক্লাস খেলোয়াড়। ম্যাচ যখন কঠিন হয়ে পড়ে, তখন আমরা তার ওপর চোখ বন্ধ করে ভরসা রাখতে পারি। সে দলে থাকায় আমাদের সামগ্রিক কার্যকারিতা আরও ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়ে যায়।”
৪ হাজার প্রবাসীর ভালোবাসায় অভিভূত ডুলি
সেরাফাল্লে স্টেডিয়ামের গ্যালারি জুড়ে থাকা প্রায় ৪ হাজার প্রবাসী বাংলাদেশির নিঃস্বার্থ সমর্থন ছুঁয়ে গেছে ডুলিকে। সমর্থকদের এই আবেগ ও ভালোবাসা দলের জন্য বড় টনিক হিসেবে কাজ করেছে বলে মনে করেন তিনি।
ডুলি বলেন, “ম্যাচের আগে ছেলেদের বলেছিলাম—দেখো, ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ৪০০০ মানুষ শুধু তোমাদের খেলা দেখতে এখানে এসেছে। চলো, আজ মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে ওদের মুখে হাসি ফোটাই, যাতে ওরা হাসিমুখে বাড়ি ফিরতে পারে। আমরা হয়তো জার্মানি বা ইতালি নই, অবশ্য ইতালি তো এবার বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই-ই করতে পারেনি! আমরা বিশ্বের সেরা দলগুলোর কাতারভুক্ত নই। তবে আমাদের সাধ্যের মধ্যে যা কিছু আছে, তা দিয়ে আমরা এই মানুষগুলোকে খুশি করার চেষ্টা করেছি। আমার মনে হয়, এটি একটি দারুণ সূচনা।”

