দুনিয়ার বুকে শত-সহস্র ক্রীড়াবিদ। কিন্তু মানব মানসপটে কতোজনের নাম খোদাই হয়ে থাকে! কতোজনের স্মৃতি অঙ্কিত হয়ে যায় হৃদয়পটে! কেবল কিছু নাম যুগ থেকে যুগান্তর পেরিয়ে রূপ নেয় কিংবদন্তিতে। তাঁরা কেবলই খেলোয়াড় নন—বরঞ্চ হয়ে ওঠেন সময়ের প্রতীক, প্রজন্মের অনুপ্রেরণা। লিওনেল আন্দ্রেস মেসি সেই বিরলদের একজন, যিনি ফুটবলকে শুধুই প্রতিযোগিতার ময়দানে আটকে রাখেননি; তিনি ফুটবলকে যেন রূপ দিয়েছেন কবিতায়, যা মাঠের সবুজ ক্যানভাসে শব্দের বদলে লেখা হয় পায়ের জাদুতে।
মেসির গোল, তাঁর অ্যাসিস্ট, ক্যারিয়ারের নানা বাঁক কেবলই পরিসংখ্যানের আলোয় উদ্ভাসিত নয়, বরং বলে তাঁর প্রতিটি ছোঁয়া যেন একেকটি মায়া। ছোট্ট গড়নের দেহে অদ্ভুত ভারসাম্য ধরে রেখে, প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে ছিন্নভিন্ন করে এগিয়ে যাওয়া যেন সাগরের স্পন্দিত ঢেউ। যে ঢেউ এখন ক্রমেই ক্লান্ত, বিশ্রাম চায়!
বুয়েন্স এইরেসের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে গেল ৪ সেপ্টেম্বরের রাতটা ছিল চেনা আবহের বাইরে। কখনো স্মৃতির ভার, কখনো কেঁপে ওঠা উৎসব, কখনো অবসাদের দীর্ঘশ্বাস। আর্জেন্টিনার মাটিতে আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে লিওনেল মেসির শেষ ম্যাচ! আবেগঘন বিদায়ের এক সন্ধ্যা যেন সেদিন হাজির হয়েছিল বুয়েন্সে। যাকে কেউ কেউ পুরোপুরি ‘বিদায়’ বলা নিয়ে কিঞ্চিৎ বিচলিত, আবার কারো কারো মতে ইতিহাস তার শেষ অধ্যায় লিখছে। আর শেষটাও কী অসাধারণ! চিরন্তন মেসির জাদুকরি স্কিলের প্রামাণ্য প্রদর্শন—জোড়া গোল! স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে থাকা প্রায় লাখো দর্শকের মনে, টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখা কোটি জনতার হৃদয়ে স্মৃতির মিনার যেন এঁকে দিলেন ‘দ্য মাস্টার’।
ভেনেজুয়েলার বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ওই ম্যাচ ঘিরে খুব বেশি শোরগোল ছিল না। কিন্তু যেই চাওর হলো, এটাই দেশের মাটিতে শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ, গোটা ফুটবল বিশ্বই যেন জেগে ওঠলো। আবেগের স্রোত বয়ে গেল বঙ্গোপসাগর থেকে নীলনদ—সবখানে। মেসির যে এটা শেষের শুরু, বিশ বছরের ক্যারিয়ারসূর্য যে অস্ত যাওয়ার পথে, এটা ভেবেই যেন ভাবাবেগ ছুঁয়ে গেল সবাইকে।
লিনেল মেসির জাতীয় দলে পথচলা শুরু সেই ২০০৫ সালের অক্টোবরে, এই মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামেই। এরপর কেবলই ইতিহাসের অগ্রযাত্রা। রেকর্ডের পাতায় পাতায় ঝড় তোলা। কিংবদন্তিদের পেছনে ফেলে নিজের নামকে উপরে বসিয়ে দেওয়া। অর্জনের ঢালিতে সমৃদ্ধ হওয়া।
কী জেতেননি মেসি! নীল-সাদা জার্সিতে সর্বোচ্চ ১৯৪ ম্যাচ খেলা মেসি গোল করেছেন ১১৪টি; যা আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বোচ্চ তো বটেই, জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বে পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোল পরিসংখ্যান। শুধু গোলই নয়, অ্যাসিস্টেও আর্জেন্টিনার হয়ে সেরা মেসি। তাঁর ৫৮ গোল সহায়তার ধারেকাছেও নেই আর কেউ। মেসি ২০০৮ অলিম্পিক স্বর্ণপদক জয় করেন, দুই-দুইবার কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন হন। ক্যারিয়ারে সব পাওয়া মেসির না পাওয়ার আক্ষেপ ছিল বিশ্বকাপ। যেজন্য হতাশায়, ব্যর্থতায় অবসর পর্যন্ত নিয়েছিলেন তিনি। জনদাবির চাপে সেই অবসর অবশ্য বেশিদিন দীর্ঘায়িত হয়নি। ফিরে আসার পর মেসির আক্ষেপও পূর্ণতায় মিলে গেছে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে। দুরন্ত ফুটবলে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে উঁচিয়ে ধরেছেন পরম আরাধ্যের ট্রফি।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে সর্বোচ্চ ৫টি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছেন মেসি। আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বোচ্চ ২৬ বিশ্বকাপ ম্যাচে অংশ নেওয়া, সর্বোচ্চ ১৯ ম্যাচে অধিনায়কত্ব করা, বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি গোল, বিশ্বকাপ বাছাইয়ে কনমেবল অঞ্চলে সর্বোচ্চ ৭২ ম্যাচে অংশগ্রহণ—সবই মেসির রেকর্ড।
ফুটবল দুনিয়ায় সর্বোচ্চ আটবার ব্যালন ডি’অর জেতা লিওনেল মেসির ক্লাব ক্যারিয়ারও স্বর্ণোজ্জ্বল। নিজের ‘আজন্মের প্রেম’ বার্সেলোনায় খেলেছেন ক্যারিয়ারের সিংহভাগ সময়। ২০০৪-০৫ মৌসুমে যে যাত্রার শুরু, তা চলেছে টানা ১৮ মৌসুম, ২০২০-২১ অবধি। এই দীর্ঘ সময়ে কাতালানদের হয়ে ৭৭৯ ম্যাচে মাঠে নেমে মেসির গোল ৬৭২টি, যা বার্সার ক্লাব ইতিহাসে সর্বোচ্চ। সঙ্গে ৩০৩টি গোলসহায়তা বার্সায় মেসিকে নিয়ে যায় অনন্য উচ্চতায়। স্প্যানিশ জায়ান্টদের হয়ে একের পর এক শিরোপাও জিতেছেন আর্জেন্টাইন পোস্টার বয়। লা লিগা ১০টি, স্প্যানিশ সুপার কাপ ৮টি, কোপা দেল রে ৭টি, বিশ্ব ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপ ৩টি, সঙ্গে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ৪টি ট্রফি জিতেন মেসি। তাঁর ক্যারিয়ারের ৮ ব্যালন ডি’অরের ৭টি আসে বার্সেলোনায় থাকাকালীন। ছয়বার ইউরোপিয়ান গোল্ডেন বুট পুরস্কারও পান এই ক্লাবেই খেলে। বস্তুত বার্সেলোনাতেই খেলে মেসি ফুল ফুটিয়ে গেছেন অবিরাম, সবুজ গালিচায় এঁকে গেছেন নিখুঁত শিল্পকর্ম।
কিন্তু যা কেউ ভাবেননি, সেটাই হয় ২০২১ সালে। বার্সালোনাই মেসির ঘরবাড়ি, এখানেই ক্যারিয়ার শেষ করবেন তিনিÑএমনটাই ছিল সবার ভাবনা। কিন্তু নানা টানাপোড়েনে বার্সা ছেড়ে আর্দ্র হৃদয়ে মেসি পাড়ি জমান ফ্রান্সে, যোগ দেন পিএসজিতে। কিন্তু সেখানকার সময়টা সুখকর ছিল না তাঁর জন্য। ৭৫ ম্যাচ খেলে ৩২ গোল ও ৩৫ অ্যাসিস্ট নিয়ে শেষ হয় মেসির পিএসজি অধ্যায়। ২০২৩ থেকে তিনি আমেরিকার মেজর লিগ সকারের ক্লাব ইন্টার মায়ামিতে খেলছেন। তুলনামূলক দুর্বল লিগ হলেও মেসির তাতে কী আসে যায়! তিনি করে চলেছেন গোল, করছেন অ্যাসিস্টও। মায়ামিতে ৭৩ ম্যাচে মেসির গোল ৬১টি, অ্যাসিস্ট ২৯টি।
এই সোনায় সোহাগা ক্যারিয়ারের পথরেখা সহজ ছিল না মোটেই। ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন রোজারিও শহরে জন্ম নেওয়া মেসির ফুটবলপ্রেম ছোটবেলা থেকেই। কিন্তু ১১ বছর বয়সে এলো বড় এক ধাক্কা। চিকিৎসকরা জানালেন, ‘গ্রোথ হরমোন ডেফিসিয়েন্সি’ নামক জটিল এক রোগে আক্রান্ত মেসি; যা তাঁর শারীরিক বৃদ্ধির পথে প্রতিবন্ধক। ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ চালাতে তাঁর পরিবার তখন হিমশিম। ওই সময়ে হাত বাড়ায় বার্সেলোনা। চিকিৎসার সব খরচ চালানোর প্রস্তাবের বিনিময়ে মেসিকে তাদের একাডেমি লা মাসিয়াতে চায় তারা। সেই প্রস্তাবে সাড়া দেওয়াই যেন বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসের মোড় বদলে গেল। মেসির চিকিৎসা চললো, তিনি যোগ দিলেন লা মাসিয়ায়, এরপর তো কেবলই নিত্য নতুন ইতিহাস! একবার ভেবে দেখুন, মেসির খবর বার্সেলোনা জানতো না, তাঁর চিকিৎসা সহায়তায় এগিয়ে যেতো না, মেসি পড়ে থাকতেন আর্জেন্টিনার এক শহরের কোণে…..এমন হলে দুনিয়া বঞ্চিত হতো এক অবিশ্বাস্য মোহাচ্ছন্ন ফুটবলের স্বাদ, ঘ্রাণ থেকে।
ভেনেজুয়েলার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে মেসি-অধ্যায় আপাতত ‘ক্লোজ’। ৪ সেপ্টেম্বরের সেই ম্যাচের প্রতিটি মুহুর্তই যেন ছিল ইতিহাসের সাক্ষী। মহাকাব্যের শেষ অধ্যায়েও রাঙিয়ে দিয়ে জাদুকর যেন ঘোষণা করলেন, ‘বিদায় নিচ্ছি, কিন্তু আমার জাদু থেকে যাবে অমোছনীয় হয়ে।’ সেই রাতে দর্শকরা কখনো কেঁদেছেন, কখনো গেয়েছেন, কখনোবা উল্লাসের করতালিতে ভরিয়ে দিয়েছেন আকাশ। মেসিও ছিলেন আবেগাপ্লুত। স্ত্রী-সন্তানদের আলিঙ্গনে তাঁর চোখ ছিল ছলছল। গোটা আর্জেন্টিনা ছিল ব্যথাতুর, স্মৃতিকাতর। কিন্তু ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তানকে ‘হ্যাটস অফ’ জানাতে ভুলেনি তারা।
সামনের দিনে মেসিকে আর্জেন্টিনা দলে কতোটা দেখা যাবে, সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। মেসি খেলবেন কি না, তা অনেক ‘যদি’ ‘কিন্তু’র মধ্যে আবদ্ধ। তবে ফুটবলবোদ্ধাদের আশা, আগামী বছর বিশ্বকাপে খেলার তাড়না আছে মেসির। যদি ফিট থাকেন, তাঁর শরীর সায় দেয়, তবেই হয়তো আরও একবার বিশ্বমঞ্চে তাঁকে দেখা যাবে। অন্তত একটি ম্যাচ খেলে তিনি বিদায় নিতে পারেন, এমন গুঞ্জনও আছে। সে না হয় সময়েই প্রকাশ্য হবে। কিন্তু মেসির উত্তরাধিকার নিয়ে প্রশ্ন এখনই ওঠছে। মেসি নেই, আর্জেন্টিনা দলে কে নেবেন তাঁর জায়গা? মেসিকে তো কেবল গোল করা, করানো কিংবা ট্রফির অঙ্কে মাপা যাবে না। শিল্প, শৈল্পিকতা, নান্দনিকতা, স্কিল, একাগ্রতা—সবমিলিয়ে তিনি তো জন্ম দিয়েছেন কিংবদন্তির!
এমন কাউকে পাওয়া যে আর সহজ হবে না, সেটা জানেন আর্জেন্টাইন কোচ লিওনেল স্কালোনি। একসময় মেসির সঙ্গেই জাতীয় দলে খেলা স্কালোনি এখন কোচিংয়ে। দেশের মাটিতে মেসির শেষ ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে স্কালোনি ছিলেন আবেগপ্রবণ, তাঁর চোখে ছিল কান্না। কিন্তু মেসির উত্তরাধিকার প্রশ্নে দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, ‘আর্জেন্টিনা বা বিশ্ব ফুটবলে মেসির উত্তরাধিকারী? না, এমন কেউ হতে পারবে না। হবেও না। হয়তো কয়েকজন দুর্দান্ত খেলোয়াড় আসবে, যারা একটি যুগকে সংজ্ঞায়িত করবে। কিন্তু এতোদিন ধরে সে যা করেছে, আমার মনে হয় তা অতুলনীয় থাকবে।’
অতুলনীয় মেসি সময়ের সীমানা পেরিয়ে যাওয়া একজন। প্রতিটি ড্রিবলে অনন্য নৃত্যের ঝড় তোলা তিনি লিখে গেছেন ‘মেঘনাদবধ কাব্য’। বিদায়ের সন্ধ্যায় দাঁড়িয়েও তাই তিনি আলোর বিচ্ছুরণ, অমরত্বের প্রতিচ্ছবি।

