বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতীকী কোলাজ।

আগামী বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। রাষ্ট্রক্ষমতার এই লড়াইয়ে রাজনৈতিক উত্তাপের মাঝেই এবার অন্যরকম এক হাওয়া বইছে ক্রীড়াঙ্গনে। দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি এবং আরেকটি দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে খেলাধুলাকে অভাবনীয় গুরুত্ব দিয়েছে। দুই দলই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে—ক্ষমতায় গেলে ক্রীড়াঙ্গনকে করা হবে সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত। পেশাদার লিগ থেকে শুরু করে স্পোর্টস ইউনিভার্সিটি—দুই দলের ইশতেহারের মূল অংশগুলো নিয়ে সাজানো হয়েছে এই প্রতিবেদন।

বিএনপির লক্ষ্য: ‘স্পোর্টস ইকোনমি’ ও আধুনিক অবকাঠামো

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি তাদের ইশতেহারে খেলাধুলাকে একটি আধুনিক ও অর্থনৈতিক খাত হিসেবে গড়ে তোলার ১০টি সুনির্দিষ্ট পয়েন্ট তুলে ধরেছে। তাদের পরিকল্পনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ক্রীড়াকে ‘পেশা ও জীবিকার মাধ্যম’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

অবকাঠামো: প্রতিটি বিভাগে বিকেএসপি, ৬৪ জেলায় ইনডোর সুবিধাসম্পন্ন ‘স্পোর্টস ভিলেজ’ এবং ৪৫০টি উপজেলায় ইনডোর স্টেডিয়াম নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি। এছাড়া ঢাকা শহরে ওয়ার্ডভিত্তিক খেলার মাঠ পুনরুদ্ধার ও গড়ে তোলার পরিকল্পনাও আছে তাদের।

শিক্ষা ও প্রযুক্তি: জাতীয় শিক্ষাক্রমে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি দেশে একটি আধুনিক ‘ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয়’ ও ‘জাতীয় স্পোর্টস রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ স্থাপনের অঙ্গীকার করা হয়েছে।

পেশাদারিত্ব: ক্রিকেট-ফুটবলের বাইরে হকি, ভলিবল ও দাবার মতো খেলাগুলোতেও পেশাদার লিগ চালু এবং ‘স্পোর্টস ডিপ্লোম্যাসি’র মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির কথা বলেছে দলটি।

জামায়াতের লক্ষ্য: ৫ বছরে ৫০০ আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়াবিদ

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের ইশতেহারে ক্রীড়াঙ্গনকে একটি ‘দেশব্যাপী সামাজিক আন্দোলন’ হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখিয়েছে। তাদের মূল লক্ষ্য বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিশ্বমানের খেলোয়াড় তৈরি করা।

ট্যালেন্ট হান্ট ও বৃত্তি: প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের জন্য মাসিক বৃত্তি এবং বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আগামী ৫ বছরে ৫০০ জন আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়াবিদ তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে জামায়াত। এজন্য একটি ‘স্পোর্টস সায়েন্স ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

ঐতিহ্যবাহী খেলা: জাতীয় খেলার মানোন্নয়নের পাশাপাশি কাবাডি, কুস্তি ও নৌকাবাইচের মতো দেশীয় ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে।

নারীদের ক্রীড়া ও স্বাস্থ্য: প্রতিটি জেলায় নারী স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাশাপাশি আলাদা ক্রীড়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে জামায়াতের। এছাড়া শিক্ষিত বেকার ক্রীড়াবিদদের জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা ‘দক্ষতা বহুমুখীকরণ ফি’ প্রদানের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

অভিন্ন সুর: রাজনীতিমুক্ত ক্রীড়াঙ্গন

বিএনপি ও জামায়াত—উভয় দলই তাদের ইশতেহারে সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছে ক্রীড়াঙ্গন থেকে দলীয় হস্তক্ষেপ বন্ধ করার ওপর।

বিএনপি বলছে, ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানগুলোতে সঠিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত রাখা হবে।

অন্যদিকে জামায়াত প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ক্রীড়াঙ্গনকে সিন্ডিকেট ও দলীয় প্রভাবমুক্ত করে দক্ষ ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার।

নির্বাচনী এই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন হলে দেশের ক্রীড়া মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিএনপি যেখানে অবকাঠামো এবং স্পোর্টস ইকোনমিতে জোর দিচ্ছে, জামায়াত সেখানে গুরুত্ব দিচ্ছে জনশক্তি উন্নয়ন ও বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণে।

মাঠের ভোটের লড়াইয়ে জয় যারই হোক, ক্রীড়াপ্রেমীদের প্রত্যাশা—ইশতেহারের এই রঙিন স্বপ্নগুলো যেন কেবল কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ না থাকে।