আর্নে স্লটের কাছে লিভারপুল মানেই ছিল ‘জয়’। কিন্তু বর্তমান প্রিমিয়ার লিগ চ্যাম্পিয়নদের জন্য এখন চ্যাম্পিয়নস লিগের যোগ্যতা অর্জনই যেন এক হিমালয়সম চ্যালেঞ্জ। ম্যানচেস্টার সিটির কাছে হারের পর অলরেডরা এখন শীর্ষ পাঁচ থেকে চার পয়েন্ট দূরে। রয় হজসনকে ছাঁটাই করার সময় লিভারপুলের যে করুণ দশা ছিল, পয়েন্ট টেবিল বলছে বর্তমান অবস্থা তার চেয়ে খুব বেশি ভালো নয়। কেন এই বিপর্যয়?
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ-এর বিশ্লেষণ থেকে উঠে এসেছে ৭টি মূল কারণ।
১. অন্তিম মুহূর্তের ‘গোল আতঙ্ক’
ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত লিভারপুল ভক্তদের এখন বুক দুরুদুরু করে। এই মৌসুমে ইনজুরি টাইমে গোল খেয়ে পয়েন্ট হারানোর ঘটনা ঘটেছে চারবার।
ক্রিস্টাল প্যালেস, চেলসি, বোর্নমাউথ এবং সর্বশেষ ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে অন্তিম লগ্নে গোল হজম করেছে অলরেডরা। লিড ধরে রেখেও শেষ মুহূর্তে মনোযোগ হারানো এখন স্লটের দলের নিয়মিত অভ্যাস।
২. সালাহ-সমস্যা ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব
গত মৌসুমের মহাতারকা মোহাম্মদ সালাহ এখন দলের জন্য এক বড় অস্বস্তি। চেলসি ও নিউক্যাসলের বিপক্ষে ম্যাচে তাঁর গতির অভাব প্রকটভাবে ধরা পড়েছে।
সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে তাঁর ‘এলান্ড রোড’ সাক্ষাৎকারে, যেখানে তিনি সরাসরি কোচ ও ক্লাবের সমালোচনা করেছেন। সালাহকে খেলানোর জন্য দলের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, আবার তাঁকে বসিয়ে রাখলে তৈরি হচ্ছে নতুন বিতর্ক।
৩. জানুয়ারির ট্রান্সফার ব্যর্থতা
লিভারপুল যাকে চেয়েছিল, তাকে পেয়েছে সিটি। মার্ক গুহিকে দলে টানতে চেয়েও ব্যর্থ হয়েছে লিভারপুলের লিগ্যাল টিম। উল্টো সিটি সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে গুয়হিকে নিয়ে নিজেদের রক্ষণ শক্ত করেছে।
এমনকি লিভারপুলের নজরে থাকা আন্তাইন সেমেনিয়োকেও সিটির কাছে হাতছাড়া করতে হয়েছে। এই ব্যর্থতা দলের গভীরতায় বড় ক্ষত তৈরি করেছে।
৪. চোটের মিছিল ও রক্ষণভাগহীন দল
রক্ষণের ডান দিকটা এখন কার্যত ফাঁকা। জেরেমি ফ্রিম্পং, কনর ব্র্যাডলি এবং জো গোমেজ—সবাই চোটের কারণে মাঠের বাইরে। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, মিডফিল্ডার সোবোসলাইকে খেলতে হচ্ছে রাইট-ব্যাক পজিশনে!
আলেকজান্ডার আইজ্যাকের মতো তারকাদের দীর্ঘমেয়াদী ইনজুরি স্লটের রণকৌশলকে পঙ্গু করে দিয়েছে।
৫. অকার্যকর ট্যাকটিক্যাল সিস্টেম
স্লটের ‘ডায়মন্ড’ বা ‘বক্স’ মিডফিল্ড ফরমেশন ইউরোপে কাজ করলেও প্রিমিয়ার লিগের গতির কাছে মার খাচ্ছে। সালাহকে কোনো রকমে দলে জায়গা দেওয়ার জন্য এই সিস্টেম সাজানো হয়েছে, যার ফলে কোডি গাকপো বা ফ্লোরিয়ান উইর্টজরা তাদের স্বাভাবিক পজিশন পাচ্ছেন না। এতে দলের আক্রমণভাগ ভোঁতা হয়ে পড়ছে।
৬. অ্যানফিল্ডের হারানো ‘ফেয়ার ফ্যাক্টর’
এক সময় প্রতিপক্ষ দলগুলো অ্যানফিল্ডে আসার আগে ভয়ে থাকত। সেই ভয় এখন উবে গেছে। শিরোপা জয়ের মৌসুমে যেখানে মাত্র একটি ম্যাচ হেরেছিল, সেখানে এবার ম্যানইউ ও নটিংহাম ফরেস্টের কাছে হার এবং বার্নলি-সান্ডারল্যান্ডের সাথে ড্র করেছে তারা। প্রতিপক্ষরা এখন অ্যানফিল্ডে এসে রক্ষণাত্মক না খেলে সরাসরি আক্রমণ করার সাহস দেখাচ্ছে।
৭. স্কোয়াডের গভীরতাহীনতা ও বেঞ্চের দুর্বলতা
সিটির বেঞ্চ থেকে যেখানে রায়ান চেরকির মতো খেলোয়াড় এসে ম্যাচ বদলে দিচ্ছেন, সেখানে স্লটের বেঞ্চে কেবল তরুণদের ছড়াছড়ি। অভিজ্ঞতার অভাবে স্লট পরিবর্তন করার সাহস পাচ্ছেন না। এমনকি সিটির বিপক্ষে ম্যাচে তিনি প্রথম সাবস্টিটিউট নামিয়েছেন ৮৫ মিনিটে। ২৫ জনের পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞ স্কোয়াড না থাকাটাই এখন স্লটের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।

