বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে আর দশটি সাধারণ দোকানের মতোই একটি। পুরান ঢাকার আরমানিটোলা স্কুলের সামনে বই-খাতার স্তূপের মাঝে কম্পিউটারে কম্পোজের কাজ করছেন এক যুবক। কিন্তু এই কি-বোর্ড চালানো হাত দুটিই যখন হকির বাঁশি হাতে মাঠে নামে, তখন নিয়ন্ত্রিত হয় বিশ্ব হকির বড় বড় সব ম্যাচ। তিনি শাহবাজ আলী—বাংলাদেশের আম্পায়ারিং জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যিনি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক হকি ফেডারেশনের (এফআইএইচ) দরবারে দেশের পতাকাকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়।
এশিয়ায় একমাত্র প্রতিনিধি: শাহবাজের বিশ্বরেকর্ড
গত ১৫ ফেব্রুয়ারি এফআইএইচ থেকে এক ঐতিহাসিক সুসংবাদ পেয়েছেন শাহবাজ। প্রাথমিক আন্তর্জাতিক প্যানেল থেকে তিনি সরাসরি উন্নীত হয়েছেন ‘হাই পটেনশিয়াল প্যানেলে’। এই অর্জনের ওজন কতটা, তা বোঝা যায় একটি পরিসংখ্যানে—সারা বিশ্বের মাত্র ১২ জন আম্পায়ার এই এলিট প্যানেলের অন্তর্ভুক্ত।
আরও গর্বের বিষয় হলো, বর্তমানে পুরো এশিয়া মহাদেশ থেকে শাহবাজই এই তালিকায় একমাত্র প্রতিনিধি। এর ফলে এখন থেকে হকির বিশ্বকাপ, অলিম্পিক এবং প্রো-লিগের মতো সর্বোচ্চ আসরে ম্যাচ পরিচালনার দরজা খুলে গেল তাঁর সামনে।
প্যানেল পরিবর্তনের নেপথ্যে
এফআইএইচের কঠিন নিয়ম অনুযায়ী, পরপর দুটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অন্তত ৮০ নম্বর পেলে তবেই পদোন্নতি মেলে। শাহবাজ সেই অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই আজ এই অবস্থানে। এশিয়ান হকি ফেডারেশনের বিশেষ প্রকল্পের অধীনে থাকা শাহবাজের এখন মূল লক্ষ্য ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক।
বাংলাদেশের কোনো আম্পায়ার এর আগে অলিম্পিকের মঞ্চে বাঁশি বাজিয়েছেন কি না তার নিশ্চিত তথ্য নেই, তবে শাহবাজ সেখানে যেতে পারলে তা হবে দেশের ক্রীড়া ইতিহাসের এক বিশাল মাইলফলক।
স্বপ্ন বনাম রূঢ় বাস্তবতা
মাঠের অর্জন আকাশচুম্বী হলেও শাহবাজের ব্যক্তিগত জীবন সংগ্রামের গল্পটি বেশ করুণ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের মুখ উজ্জ্বল করলেও হকি থেকে তাঁর জীবন চলেনা। বড় ভাইয়ের দোকানে বই বিক্রি আর কম্পোজের কাজ করেই সংসার টানতে হয় তাঁকে।
আক্ষেপ করে শাহবাজ বলেন, “অনেক জায়গায় চাকরির চেষ্টা করেছি, কিন্তু আম্পায়ারিংয়ের জন্য লম্বা ছুটি পাওয়া যায় না বলে চাকরি হয়নি। আমি চাই সরকার আমাদের মতো আম্পায়ার-রেফারিদের দিকে একটু নজর দিক।”
হকির দুর্দিনে আশার আলো
বাংলাদেশের ঘরোয়া হকি যখন বিতর্ক আর স্থবিরতায় জর্জরিত, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও যখন সাফল্যের খরা—তখন শাহবাজ আলীর এই ব্যক্তিগত অর্জন দেশের হকির জন্য এক পশলা বৃষ্টির মতো। সেলিম লাকি ও শাহবাজ—বর্তমানে এই দুজনই দেশের আন্তর্জাতিক আম্পায়ার। শাহবাজের দুচোখে এখন কেবলই অলিম্পিকের স্বপ্ন, যা তিনি বয়ে নিয়ে চলেছেন আরমানিটোলার সেই ছোট্ট দোকান থেকে মাঠের ঘাস পর্যন্ত।

