জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক এখন দেশের ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীযুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক।

ফুটবল মাঠের অতন্দ্র প্রহরী থেকে আজ তিনি দেশের ক্রীড়াঙ্গনের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক। দীর্ঘ রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই আর ত্যাগের পর ‘টেকনোক্র্যাট কোটায়’ যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক। হাফিজ উদ্দিন আহমদ বা আরিফ খান জয়ের পর আরও এক ফুটবলারের এই মন্ত্রিসভায় আরোহণ কেবল এক ব্যক্তির উত্থান নয়, বরং মাঠ থেকে মসনদে পৌঁছানোর এক রোমাঞ্চকর মহাকাব্য।

পাইওনিয়ার লিগের সেই ‘বিস্ময়’

ভোলার ছেলে আমিনুলের বেড়ে ওঠা ঢাকার মিরপুরে। বড় ভাই মঈনুল হকের হাত ধরেই ফুটবলে হাতেখড়ি। খ্যাপ খেলে পাওয়া প্রথম ১৫০ টাকা মায়ের হাতে তুলে দেওয়ার সেই তৃপ্তিই তাঁকে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। পাইওনিয়ার লিগের এমএসপিসি সিটি ক্লাবে তাঁর শুরুটা ছিল অবিশ্বাস্য—প্রথম ৯ ম্যাচে একটি গোলও হজম করেননি তিনি। সেই দক্ষতা দেখে ইস্ট এন্ড ক্লাব প্রস্তাব দিলেও ভাই মঈনুল ও কিংবদন্তি জনির সহায়তায় তিনি নাম লেখান মোহামেডানে। যদিও শুরুতে সাঈদ হাসান কাননের ছায়ায় তৃতীয় গোলরক্ষক হিসেবে থাকতে হয়েছিল তাঁকে।

আবাহনী-মোহামেডান যুদ্ধ

১৯৯৬ সালে ফরাশগঞ্জের হয়ে আমিনুলের ক্যারিয়ার নতুন মোড় নেয়। কোচ প্রাণ গোবিন্দ কুণ্ডুর অধীনে তিনি তখন অপ্রতিরোধ্য। সেই মৌসুমে আবাহনী ও মোহামেডানের বিপক্ষে দুই পর্বের চার ম্যাচেই ড্র করে ফরাশগঞ্জ।

মজার ব্যাপার হলো, আবাহনীকে রুখলে মোহামেডান দিত ১০ হাজার টাকা পুরস্কার, আবার মোহামেডানকে রুখলে আবাহনী দিত সমপরিমাণ অর্থ। বড় দলগুলোর এই স্বীকৃতিই আমিনুলকে বড় মঞ্চের জন্য তৈরি করেছিল।

সাফ জয় ও এসএ গেমসের অমর বীরত্ব

২০০৩ সালে ঢাকার মাঠে মালদ্বীপের বিপক্ষে টাইব্রেকারে আমিনুলের সেই দ্বিতীয় শটটি রুখে দেওয়া আজো বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ অর্জন। এরপর ২০১০ এসএ গেমসে তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ সোনা জেতে এবং পুরো টুর্নামেন্টে তিনি একটি গোলও হজম করেননি। কাতার যুব দলের সাথে ড্র করার পর দোহার এক প্রবাসীর দেওয়া ২০০ রিয়াল বা দাম্মামের রাস্তায় প্রবাসীদের সেই ভালোবাসা আমিনুলের জীবনের অমূল্য সঞ্চয়।

অস্ট্রিয়ান কোচ জর্জ কোটান বলতেন, আমিনুলের সামর্থ্য ছিল ইউরোপের লিগে খেলার। একবার কাতারের আল হিলাল ক্লাব তাঁকে নিতে চাইলেও ভাগ্যের ফেরে তা সম্ভব হয়নি।

২০১১ সালে সৌদি আরবের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ম্যাচে আমিনুল হক।
২০১১ সালে সৌদি আরবের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ম্যাচে আমিনুল হক। ছবি: এএফপি

অপহরণ নাটক: ১২ দিনের সেই শ্বাসরুদ্ধকর রহস্য

আমিনুলের ক্যারিয়ারের সবচাইতে চাঞ্চল্যকর অধ্যায়টি ঘটে ২০০০ ও ২০০৩ সালের দলবদলের সময়। ২০০৩ সালে আবাহনী ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের লড়াইয়ের জেরে মুন্সিগঞ্জে ১২ দিন লুকিয়ে রাখা হয় তাঁকে। তাঁর ভাই মঈনুল হক আবাহনীর বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা করলে পুলিশ ধানমন্ডির আবাহনী ক্লাবে নজিরবিহীন অভিযান চালায়।

অথচ এর কয়েক ঘণ্টা পরই নাটকীয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের অফিসে হাজির হয়ে আমিনুল দাবি করেন, বন্দুকের মুখে তাঁকে তুলে নেওয়া হয়েছিল আবাহনী ক্লাবে, পরে রাখা হয় মোহাম্মদপুরের এক বাড়িতে। তিনি মোহাম্মদপুরের ওই বাড়ির দোতলার ব্যালকনি থেকে লাফ দিয়ে পালিয়ে এসেছেন।

আরও পড়ুন: ভূ-রাজনীতির বলি ক্রিকেট, লাভ শুধু ফ্র্যাঞ্চাইজিদেরই

রাজপথের কণ্টকাকীর্ণ পথ ও নতুন সূর্যোদয়

মাঠ থেকে অবসর নিয়ে আমিনুল বেছে নেন বিএনপির রাজনীতি। কিন্তু গত দেড় দশকে তাঁকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে দিনের পর দিন কারাগারে কাটাতে হয়েছে তাঁকে। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-১৬ আসনে স্বল্প ব্যবধানে হারলেও তাঁর মেধা ও ত্যাগের মূল্যায়ন করেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। মাঠের গোলপোস্ট যেমন আগলে রাখতেন, আজ তিনি তেমনি দায়িত্ব পেয়েছেন পুরো দেশের ক্রীড়াঙ্গন আগলে রাখার।