জেনিকার স্টেডিয়ামে বসনিয়ার কাছে হারের পর কান্নায় ভেঙে পড়েছেন ইতালির ফুটবলাররা।ইতালিয়ানদের অসহায় কান্না! ছবি: রয়টার্স

ফুটবল কখনো কখনো বড্ড নিষ্ঠুর, বড্ড বেশি আর্তনাদমাখা। জেনিকার বিলিনো পোলজে স্টেডিয়ামের ঘাসে যখন এসিমির বাজরাকতারভিচ শেষ পেনাল্টিটি জালে জড়ালেন, তখন শুধু একটি গোল হয়নি; বরং কয়েক কোটি ইতালিয়ান হৃদয়ে আরও একবার ‘খঞ্জর’ বিদ্ধ হলো। জিয়ানলুইজি দোন্নারুম্মা যখন মাথা নিচু করে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তখন তাঁর চোখের সামনে হয়তো ভেসে উঠছিল ২০১৭ সালের সেই সুইডেন ট্র্যাজেডি কিংবা ২০২২ সালের উত্তর মেসিডোনিয়ার সেই অভিশপ্ত রাত। কিন্তু এবারের ক্ষতটা যেন সব ছাপিয়ে গেল। টানা তিনবার! হ্যাঁ, টানা ১২ বছর ধরে FIFA World Cup-এর মঞ্চে নেই চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা—এই অবিশ্বাস্য সত্যটি হজম করা কি কোনো রক্ত-মাংসের মানুষের পক্ষে সম্ভব?

বাস্তোনির সেই লাল কার্ড: আত্মাহুতি না কি হন্তারক?

বসনিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটা ইতালির হাতের মুঠোয় ছিল। ১৫ মিনিটে নিকোলো বারেল্লার পাসে ময়েজ কিনের সেই ঠান্ডা মাথার ফিনিশিং দেখে মনে হচ্ছিল, রোমের রাজপথে আজ আবার নীল উৎসব হবে। কিন্তু ৪১ মিনিটে যেন আকাশ ভেঙে পড়ল ইতালির ওপর। আমর মেমিচকে রুখতে গিয়ে আলেসান্দ্রো বাস্তোনি যখন লাল কার্ড দেখলেন, তখন ধারাভাষ্যকারের সেই একটি বাক্যই কোটি ইতালিয়ানের কানে বাজছে—“এটাই কি ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট?”

বাস্তোনি হয়তো গোলটা বাঁচাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর সেই ‘আত্মাহুতি’ শেষ পর্যন্ত ইতালির জন্যই হন্তারক হয়ে দাঁড়াল। ১০ জনের দল নিয়ে কতক্ষণ আর ঠেকানো যায়? ৭৯ মিনিটে তাবাকোভিচের সেই গোলটি ছিল ইতালির হৃদপিণ্ডে শেষ পেরেক।

দোন্নারুম্মার অসহায়ত্ব ও অমোচনীয় দুঃখ

টাইব্রেকার মানেই লটারি, কিন্তু ইতালির জন্য এটি এখন এক মরণফাঁদ। পিও এসপোসিতোর শট যখন পোস্টের ওপর দিয়ে গেল আর ব্রায়ান ক্রিস্তান্তের শট ক্রসবারে লেগে ফিরে এল, তখন ডাগআউটে জেনারো গাত্তুসোর সেই পাথুরে মুখটাই বলে দিচ্ছিল সব শেষ। Gianluigi Donnarumma, যিনি কি না পেনাল্টি সেভের রাজা, তিনিও আজ পারলেন না বসনিয়ার নিখুঁত চারটি শট রুখতে।

জেনারো গাত্তুসোর চোখে জল সচরাচর দেখা যায় না, কিন্তু ম্যাচ শেষে যখন এই লৌহমানব বললেন, “আমি আমার জীবনের কয়েকটা বছর বা সব টাকা দিয়ে দিতাম শুধু এই লক্ষ্যটা পূরণ করতে”—তখন বুঝতে বাকি থাকে না ইতালিয়ান ফুটবলের রক্তক্ষরণ কতটা গভীর।

গাত্তুসো আরও বলেন, “এটা কষ্টের। কারণ এটা গোটা ইতালির জন্য প্রয়োজন ছিল। এই ধাক্কা হজম করা সত্যিই কঠিন।”

২০৩০ পর্যন্ত দীর্ঘ বিরহ: কেন এই পতন?

যে Italy ২০০৬ সালে বিশ্ব জয় করেছিল, যারা ২০২১ সালে ইউরো চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল, তারা কেন আজ র‍্যাঙ্কিংয়ের ৭১ নম্বর দল বসনিয়ার কাছে হেরে বিদায় নিল? বিশ্লেষকরা বলবেন সেরি-আ লিগে ভিনদেশি খেলোয়াড়দের দাপট কিংবা একাডেমি থেকে মানসম্পন্ন স্ট্রাইকার না আসার কথা।

কিন্তু একজন সাধারণ সমর্থকের কাছে এসব যুক্তি বড়ই তুচ্ছ। তাদের কাছে সত্য শুধু একটাই—আজকের ইতালিয়ান শিশুরা জানেই না বিশ্বকাপে তাদের দেশ কেমন খেলে! টানা তিনবার বিশ্বকাপে সুযোগ না পাওয়া প্রথম সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার এই কলঙ্কিত রেকর্ড ইতালিকে তাড়া করে ফিরবে ২০৩০ সাল পর্যন্ত।

আরও পড়ুন: ফিফা সভাপতির বড় ঘোষণা: ইরান বিশ্বকাপ খেলবে যুক্তরাষ্ট্রেই!

একটি যুগের অবসান এবং বসনিয়ার রূপকথা

বসনিয়া ১২ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরল, তাদের নীল জার্সিতে আজ উৎসবের রং। কিন্তু ইতালির নীল আজ কেবলই বিষাদ। স্পিনাজোলার সেই কান্নাভেজা কণ্ঠস্বর, “ইতালির শিশুরা আরও একবার ইতালিকে ছাড়াই বিশ্বকাপ দেখবে”—এটি কেবল একটি উক্তি নয়, এটি একটি ফুটবল জাতির পতনগাথা।

রোমের অলিতে-গলিতে আজ হয়তো কেউ বিশ্বাস করতে পারছে না তারা চারবারের বিশ্বসেরা। ফুটবল বিধাতা কি সত্যিই আজ্জুরিদের ওপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন?