ফুটবল বিশ্বের বিস্ময় বালক লিওনেল মেসি যখন বার্সেলোনার মূল দলে প্রথম পা রেখেছিলেন, তখন তার এলোমেলো চুল আর ছোটখাটো গড়ন দেখে কেউ ভাবতেও পারেনি এই কিশোর ফুটবল ইতিহাস বদলে দেবেন। কিন্তু বল যখনই Messi’র পায়ে যেত, তখনই মনে হতো মাঠের স্পেস আর বলের নিয়ন্ত্রণ যেন তার হাতের তালুর কোনো জাদুমন্ত্র। ঠিক একইভাবে, ১৬ বছরের এক কিশোর এখন ক্রিকেট বিশ্বকে সেই একই অনুভূতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। নাম তার বৈভব সূর্যবংশী।
সহজাত প্রতিভা বনাম গাণিতিক ব্যাকরণ
লিওনেল মেসির খেলায় যেমন কেবল পেশি বা গতির লড়াই ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত ‘ইনটুইশন’ বা সহজাত বোধ; Vaibhav Sooryavanshi’র ব্যাটিংয়েও ঠিক সেই ছায়া দেখছে ক্রিকেট দুনিয়া। যেসব বলে বিশ্বের সেরা ব্যাটাররা পরাস্ত হন, সেস্ব বলকে যে নিপুণতায় বৈভব সীমানা ছাড়া করেন, তাতে আভিজাত্য ফুটে ওঠে শতভাগ।
এ যেন কেবল শট খেলা নয়, বরং বলের লাইন-লেংথকে সেকেন্ডের কয়েক হাজার ভাগের এক ভাগ সময়ে পড়ে ফেলার ক্ষমতা—যা মেসিকে আলাদা করেছিল ফুটবল মাঠে।
হ্যাজেলউডের ‘মরণফাঁদ’ ও বৈভবের শিল্প
IPL-এ কাল রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর (RCB) বিপক্ষে ম্যাচের সেই মাহেন্দ্রক্ষণটি ছিল দেখার মতো। জশ হ্যাজেলউড তখন তার সেরা ছন্দে, নিখুঁত লাইন-লেংথে যশস্বী জসওয়ালকে মাত্রই প্যাভিলিয়নে পাঠিয়েছেন। বৈভবের সামনে তিনি ছুড়লেন সেই একই বিষাক্ত ডেলিভারি—যা অফ স্টাম্পের ওপর লাফিয়ে উঠে ভেতরে ঢুকছিল। যেকোনো বাঁহাতি ব্যাটারের জন্য এটি ছিল এক মরণফাঁদ।
আরও পড়ুন: আইপিএল: সূর্যবংশী-বুমরাহ দ্বৈরথে লারার ব্যাক-লিফট আর ব্র্যাডম্যানের ক্ষিপ্রতা!
কিন্তু সূর্যবংশী যেন আগে থেকেই জানতেন বলের গতিপথ। অনেকটা মেসির ড্রিবলিংয়ের মতো শেষ মুহূর্তে শরীরকে বলের লাইন থেকে সরিয়ে, কবজির সূক্ষ্ম মোচড়ে বলটিকে থার্ড ম্যান এলাকা দিয়ে বাউন্ডারিতে পাঠিয়ে দিলেন তিনি। এটি কেবল শট খেলা নয়, বরং বলের গতিকে নিজের শিল্পে রূপান্তর করা—যা সাধারণ কোনো কিশোরের পক্ষে ভাবাই অসম্ভব।
সতীর্থদের চোখে এক ‘অপ্রার্থিত’ প্রতিভা
মেসি যখন তরুণ বয়সে ড্রেসিংরুমে ঢুকতেন, রোনালদিনহোর মতো মহাতারকারা বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতেন। বৈভবের ক্ষেত্রেও তাই ঘটছে। রাজস্থান রয়্যালসের সতীর্থ, ভারতের টেস্ট ক্রিকেটার ধ্রুব জুরেল যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না।
কাল ২৬ বলে ৭৮ রানের সেই টর্নেডো ইনিংস দেখে জুরেল বলেন, “আপনি যখন ওকে দেখেন, স্রেফ মাথা চুলকাতে হবে। আমরাও একই পিচে ব্যাট করছি, কিন্তু ও যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে, তা আমাদের আয়ত্তের বাইরে। ও সত্যিই এক স্রষ্টা-প্রদত্ত প্রতিভা।”
আরও পড়ুন: শচীন-কোহলিদের উত্তরসূরি বৈভব সূর্যবংশীর অবিশ্বাস্য উত্থান যেভাবে
বাইরে কিশোর, ভেতরে গুরু
মেসির মতো বৈভবও মাঠের বাইরে অত্যন্ত শান্ত এবং ঘরকুনো। অধিনায়ক রিয়ান পরাগের মতে, “ও বাচ্চার মতোই আচরণ করে, খেতে ভালোবাসে, ঘুরতে ভালোবাসে। কিন্তু হাতে যখন ব্যাট থাকে, ও যেন বদলে যাওয়া এক মানুষ।”
এই বয়সেই প্রতিপক্ষ বোলারদের মনে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করার ক্ষমতা বলে দিচ্ছে, বৈভব সূর্যবংশী কেবল আগামীর তারকা নন; তিনি বর্তমানেই এক প্রতিষ্ঠিত শক্তি।
মেসি-ফ্যাক্টর: সবাইকে ছাপিয়ে যাওয়া
মেসি মাঠে থাকা মানেই যেমন সতীর্থদের কাজ সহজ হয়ে যেত, বৈভব উইকেটে থাকলে ২০২ রানের লক্ষ্যকেও রাজস্থান রয়্যালসের কাছে মনে হচ্ছিল ছেলেখেলা। তিনি যখন আউট হয়ে ফিরলেন, তখন সহজ লক্ষ্যটিও পাহাড় মনে হচ্ছিল। ঠিক যেমনটি বার্সেলোনায় মেসির ক্ষেত্রে হতো—তার উপস্থিতি দলকে অপ্রতিরোধ্য করে তুলত, আর অনুপস্থিতি মনে করিয়ে দিত বাস্তবতার রুক্ষতা।
ক্রিকেট মাঠে এই কিশোরের ইনিংসগুলোর প্রতিটি স্তর যখন ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে, তখন ভক্তরা রোমাঞ্চিত হয়ে ভাবছেন—আমরা কি তবে ক্রিকেটের সেই ‘মেসি’কে পেয়ে গেলাম, যার জন্য ব্যাকরণ কেবল একটি শব্দমাত্র?

