উত্তর আমেরিকার তিন দেশে ফুটবল বিশ্বকাপের মেগা আসর শুরু হতে আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি। বিশ্বমঞ্চের এই মহাযুদ্ধের মাঠ মাতাতে তৈরি বিশ্ব ফুটবলের একঝাঁক তরুণ প্রতিভাবান ফুটবলার। অনূর্ধ্ব-২১ বয়সী এমন সব রোমাঞ্চকর উইন্ডারকিডদের নিয়ে ক্রিকফুট২৪-এর বিশেষ আয়োজন ‘বিশ্বকাপের বিস্ময়’।
আজ আমাদের এই সিরিজের ৪র্থ পর্বে স্পটলাইট থাকছে স্বাগতিক মেক্সিকো এবং এই বিশ্বকাপের সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার গিলবার্তো মোরার ওপর।
একনজরে গিলবার্তো মোরা
জন্ম তারিখ: ১৪ অক্টোবর, ২০০৮
বর্তমান দল: মেক্সিকো জাতীয় দল এবং ক্লাব টিজুয়ানা
আন্তর্জাতিক অভিষেক: ২৮ জুন, ২০২৫ (সৌদি আরবের বিপক্ষে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে)
খেলার পজিশন: অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার
মূল দক্ষতা: গেম ইন্টেলিজেন্স, রক্ষণ চেরা থ্রু-পাস, দারুণ বল কন্ট্রোল, চাপের মুখে শান্ত থাকা এবং বয়সের তুলনায় অবিশ্বাস্য পরিপক্বতা।
আরও পড়ুন:
বিশ্বকাপের বিস্ময়-১: ব্রাজিলের হেক্সা মিশনের মূল বাজি এনড্রিক
কেন হতে পারেন বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ
ঘরের মাঠে ২০২৬ বিশ্বকাপ খেলতে নামার আগে এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে মেক্সিকো।
ঘরের মাঠের আকাশচুম্বী চাপ সামলানোর পাশাপাশি দলটিতে প্রয়োজন ছিল নতুন কোনো অনুপ্রেরণার। আর ঠিক এই পটভূমিতেই মেক্সিকান ফুটবলে ধূমকেতুর মতো আবির্ভাব ১৭ বছর বয়সী গিলবার্তো মোরার। মেক্সিকোর দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর তুক্সত্লা গুতিয়েরেজে জন্ম নেওয়া এই তরুণ তাঁর ক্লাব টিজুয়ানার হয়ে যখন শীর্ষ লিগে ডেব্যু করেন, তখন তাঁর ১৬ বছর পূর্ণ হতেও দুই মাস বাকি ছিল!
এরপর থেকেই মেক্সিকোর জাতীয় পতাকায় থাকা ঈগলের মতোই আকাশে ডানা মেলেছেন মোরা।
মেক্সিকান লিগের (Liga MX) সব কনিষ্ঠতম রেকর্ড ভেঙে চুরমার করেছেন তিনি। গত ২০২৫ সালে চিলিতে অনুষ্ঠিত ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে মেক্সিকোকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলতে রেখেছিলেন প্রধান ভূমিকা।
সেই টুর্নামেন্টেই মূলত তাঁর ফুটবলীয় পরিপক্বতা বিশ্বের বড় বড় স্কাউটদের নজর কাড়ে।
১৬ বছর বয়সেই সিনিয়র দলে ইতিহাস
জাতীয় দল ‘এল ত্রি’র জার্সিতে মোরার আসল ব্রেক-আউট আসে ২০২৫ সালের কনকাকাফ গোল্ড কাপে।
মেক্সিকোর অভিজ্ঞ কোচ হাভিয়ের আগুয়েরে কোয়ার্টার ফাইনালের মতো হাইভোল্টেজ ম্যাচে সৌদি আরবের বিপক্ষে মাত্র ১৬ বছর বয়সে মোরাকে মাঠে নামিয়ে দেন। এর মাধ্যমে মেক্সিকোর ফুটবল ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে সিনিয়র জাতীয় দলে অভিষেকের মহাকীর্তি গড়েন তিনি।
এখানেই শেষ নয়, সেমিফাইনালে হন্ডুরাসের বিপক্ষে রাউল হিমেনেজের জয়সূচক গোলটির অ্যাসিস্টও এসেছিল এই বিস্ময় বালকের পা থেকে।
মাঠের প্রতিপক্ষের রক্ষণাত্মক লাইনের ফাঁক গলে বলের পজিশন নেওয়া, নিখুঁত টাইমিংয়ে থ্রু-পাস দেওয়া এবং যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি থেকে বল বের করে নেওয়ার এক ঈশ্বরদত্ত ক্ষমতা রয়েছে মোরার।
মেক্সিকোর এই অভিজ্ঞ স্কোয়াডে আক্রমণভাগে যেখানে একটু সৃজনশীলতার অভাব ছিল, সেখানে মোরা যোগ করেছেন এক নতুন গতি ও বৈচিত্র্য।
ঘরের মাঠে এবারের বিশ্বকাপে মাঠে নামলেই মেক্সিকোর ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ বিশ্বকাপার হওয়ার রেকর্ড গড়বেন এই মিডফিল্ডার।
তবে বাইরের কোনো কোলাহল বা চাপকে একদমই গায়ে মাখছেন না তিনি। নিজের লক্ষ্য নিয়ে মোরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, “আমি আমাদেরকেই এই বিশ্বকাপ জয়ের প্রধান দাবিদার মনে করি। আমরা ঘরের মাঠে খেলব, তাই অবশ্যই আমরাই পোল পজিশনে আছি।”
আরও পড়ুন:
বিশ্বকাপের বিস্ময়-২: স্পেনের ডানা ঈশ্বরপ্রদত্ত উপহার লামিনে ইয়ামাল
মোরাকে নিয়ে ফুটবল বিশ্বের কিংবদন্তিরা যা বলছেন
“আমরা ওকে গোল্ড কাপে নিয়ে এসেছিলাম। ওর অনুশীলনের ধরণ এবং মাঠের বাইরের পরিপক্বতা দেখেই বুঝেছিলাম ওকে খেলাতেই হবে। ওর মধ্যে সেই বিশেষ প্রতিভা আছে, যা আমাদের দেশের বেঞ্জামিন গ্যালিন্ডো বা কুয়াউহতেমক ব্লাঙ্কোর মতো লিজেন্ডদের মধ্যে ছিল। মেক্সিকোর হাতে এখন একজন বিশ্বমানের খেলোয়াড় আছে।”
— হাভিয়ের আগুয়েরে (মেক্সিকোর প্রধান কোচ)
“কাগজে-কলমে ওর বয়স ১৭ হতে পারে, কিন্তু ও যেভাবে অনুশীলন করে আর ম্যাচ খেলে, তা ২৫ বা ২৬ বছরের একজন পরিপক্ব খেলোয়াড়ের মতো। গত ১৫-২০ বছরে মেক্সিকান ফুটবলে ও-ই সবচেয়ে বড় প্রতিভা। ওকে দেখলে আমার আলভারো রিকোয়ার কথা মনে পড়ে যায়।”
— সেবাস্টিয়ান আব্রেউ (টিজুয়ানা কোচ)
“আমি অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে বিশেষ করে মরক্কো এবং স্পেনের বিপক্ষে ওর খেলা খুব কাছ থেকে দেখেছি। ও সত্যিই আমার চোখ কেড়ে নিয়েছে। মেক্সিকো দলে ও খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”
— রবার্তো মার্টিনেজ (পর্তুগালের প্রধান কোচ)
২০২৬ বিশ্বকাপে মোরার মেক্সিকোর গ্রুপ পর্বের সূচি
১১ জুন: মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা (মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়াম – বিশ্বকাপের উদ্বোধনী দিন)
১৮ জুন: মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ কোরিয়া (গুয়াদালাহারা স্টেডিয়াম)
২৪ জুন: চেক প্রজাতন্ত্র বনাম মেক্সিকো (মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়াম)
আরও পড়ুন:
বিশ্বকাপের বিস্ময়-৩: ফ্রান্সের ‘ইঞ্জিন’ এমেরি, ২০ বছর বয়সেই ১৩ ট্রফি!

