আর্জেন্টিনার মহাতারকা লিওনেল মেসি।লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনার ফুটবলের মহাতারকা। ছবি: গেটি

মাঠে সাফল্যের গল্প লিখছে আর্জেন্টিনা। কিন্তু মাঠের বাইরে দেশটির ফুটবল প্রশাসন এখন বিতর্কের কেন্দ্রে। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের পেছনের সংস্থাটি জড়িয়ে পড়েছে একের পর এক অভিযোগে।

২০২৪ সালের মার্চে সাবেক তারকা ফুটবলার কার্লোস তেভেজ একটি টুইটে প্রথম ইঙ্গিত দেন বিষয়টির। বুয়েন্স আয়ার্সের শহরতলি পিলারকে ঘিরে সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের কথা জানান তিনি। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের এক শীর্ষ কর্মকর্তার নিয়মিত যাতায়াতের তথ্য।

তেভেজ ইঙ্গিত দেন, ওই এলাকায় মাটির নিচে টাকার ব্যাগ লুকানো থাকতে পারে। পাশাপাশি সেখানে বিলাসবহুল ও পুরোনো গাড়ির একটি বড় সংগ্রহ থাকার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

এই টুইটের পরই নড়েচড়ে বসে প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল ‘কোয়ালিশন সিভিভিকা’। তারা পিলারের একটি ভিলাকে কেন্দ্র করে ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করে। অভিযোগে বলা হয়, বিশ্বকাপ সামনে রেখে ওই সম্পত্তি অর্থ পাচারের কাজে ব্যবহৃত হতে পারে।

ঘটনাটি সামনে আসতেই আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের বিরুদ্ধে চলমান বিতর্ক আরও গভীর হয়। ডিসেম্বরের শুরুতে পুলিশ এএফএ সদর দপ্তরসহ এক ডজনের বেশি ফুটবল ক্লাবে অভিযান চালায়। তদন্তের মূল বিষয় ছিল ক্লাবগুলোর সঙ্গে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সন্দেহজনক লেনদেন।

পিলারের ভিলায় অভিযানে কর্তৃপক্ষ খুঁজে পায় একটি হেলিপোর্ট, আস্তাবল এবং বিলাসবহুল গাড়ির বিশাল সংগ্রহ। মোট ৫৪টি যানবাহন জব্দ করা হয়। এর মধ্যে ফেরারি ও পোরশের মতো দামি গাড়িও রয়েছে।

কোয়ালিশন সিভিভিকার অভিযোগ অনুযায়ী, এই ভিলাটি এএফএ সভাপতি ক্লদিও ‘চিকি’ তাপিয়া এবং কোষাধ্যক্ষ পাবলো তোভিগিনোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি অর্থ পাচার চক্রের কেন্দ্র হতে পারে।

আর্জেন্টিনার প্রভাবশালী দৈনিক লা নাসিওন জানায়, গত সপ্তাহে একটি মামলায় দেশটির কর বিভাগ ১৩ মিলিয়ন ডলার কর ফাঁকির অভিযোগ এনেছে। অভিযুক্তদের মধ্যে তাপিয়া, তোভিগিনোসহ একাধিক এএফএ কর্মকর্তা রয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য চাওয়া হলেও এএফএ কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

তবে সংস্থাটি এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, তারা প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। মিলেই আর্জেন্টিনার ফুটবল ক্লাবগুলোকে অলাভজনক কাঠামো থেকে ব্যক্তিমালিকানাধীন লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে চান।

এএফএর বক্তব্য, নেতৃত্বে আসার পর থেকে তারা সঠিক পথেই রয়েছে। ২০১৭ সালে তাপিয়া দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২২ বিশ্বকাপসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সাফল্যের কথা তুলে ধরে সংস্থাটি।

আরও পড়ুন:
বিশ্বকাপ জেতা কঠিন, ছোট কারণে বাদ যাবেন: মেসি

মাঠে আর্জেন্টিনার সাফল্য প্রশ্নাতীত। কিন্তু প্রশাসনিকভাবে এএফএ সাম্প্রতিক বছরগুলোর সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে। ক্রীড়া সাংবাদিক নেস্টর সেন্ট্রার ভাষায়, ‘এখন আর্জেন্টিনায় দুটি এএফএ রয়েছে। একটি বিশ্বজয়ী, আরেকটি দেশের ভেতরে অস্থির।’

পিলারের সম্পত্তির মালিকানা তদন্তে যুক্ত আইনজীবী মাতিয়াস ইয়োফে জানান, সেখানে কর্মরতদের বক্তব্যও সন্দেহ বাড়িয়েছে। কয়েকজন কর্মচারী জানিয়েছেন, তাপিয়া বা তোভিগিনোই ওই জায়গার প্রকৃত মালিক হতে পারেন। একজন জানান, তাপিয়া একবার হেলিকপ্টারে করে এসে কর্মীদের জাতীয় দলের জার্সি উপহার দেন।

আদালতের নথিতে উল্লেখ আছে, অভিযানে এএফএর লোগোযুক্ত একটি ব্যাগ, তোভিগিনোর নাম খোদাই করা সামগ্রী, ফুটবলবিষয়ক বই এবং একটি সম্মাননাস্মারক উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০১৭ সাল থেকে প্রায় অর্ধ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক হিসাব চেয়েছে বিচার মন্ত্রণালয়, যার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা এখনো মেলেনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তদন্তের প্রভাব মাঠের খেলায় পড়বে না। ক্রীড়া আইন বিশেষজ্ঞ অ্যালান ওয়াইল্ডারের ভাষায়, লিওনেল মেসির মতো খেলোয়াড়কে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়ার ঝুঁকি কেউ নেবে না। তাঁর মতে, ‘মেসি আর্জেন্টিনার জন্য কেবল একজন খেলোয়াড় নন, তিনি জাতীয় আবেগের প্রতীক।’