বিপিএল দল চট্টগ্রাম রয়্যালস

ম্যাচের আগের দিন সাধারণত ক্রিকেটারদের সূচিতে থাকে হালকা অনুশীলন, ভিডিও বিশ্লেষণ আর শেষ মুহূর্তের ম্যাচ পরিকল্পনা। কিন্তু বিপিএলে নিজেদের প্রথম ম্যাচের আগে চট্টগ্রাম রয়্যালসের জন্য এসব কিছুই ছিল বিলাসিতা। কারণ, ম্যাচের একদিন আগেও নিশ্চিত ছিল না—দলটির মালিক আসলে কে!

বিপিএলের প্রথম দিনেই মাঠে নামতে হয়েছিল চট্টগ্রামকে। তার ঠিক আগের দিন ফ্র্যাঞ্চাইজিটির স্বত্বাধিকারী দায়িত্ব ছেড়ে দেন। বাধ্য হয়ে হাল ধরতে হয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে (বিসিবি)। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বদলে যায় পুরো ব্যবস্থাপনা। এমন পরিস্থিতিতে পরিকল্পনা নয়, বরং দলটাকে দাঁড় করানোই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।

বিদেশি ক্রিকেটার ছিলেন মাত্র দুজন—মির্জা বেগ ও মাসুদ গুরবাজ। খুব পরিচিত নামও নয়। কোনো রকমে একাদশ গুছিয়েই টুর্নামেন্ট শুরু করে চট্টগ্রাম রয়্যালস।

অথচ সেই এলোমেলো শুরু করা দলটাই এখন বিপিএলের সবচেয়ে স্থির চেহারা। সাত ম্যাচে পাঁচ জয়ে পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে চট্টগ্রাম। ধারাবাহিকতায়ও সবার ওপরে। প্রশ্ন তাই স্বাভাবিক—কীভাবে সম্ভব হলো এই রূপান্তর?

বিপিএর ফ্র্যাঞ্চাইজি চট্টগ্রাম রয়্যালস
শরীফুলের বোলিং, ওপেনিংয়ে দারুণ জুটি আর মেহেদীর নেতৃত্বে ছন্দে আছে চট্টগ্রাম।

কার্যকর টি–টোয়েন্টি বোলিং

দলটির অধিনায়ক মেহেদী হাসান শুরু থেকেই এক কথা বলে আসছেন—“আমাদের বোলিং ইউনিট ভালো।” কথার পেছনে ফলও মিলছে।

বাঁহাতি পেসার শরীফুল ইসলাম এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি। সাত ম্যাচে তাঁর শিকার ১৩ উইকেট। ওভারপ্রতি রান খরচ ৬.৯২, অথচ পাওয়ার প্লে আর ডেথ—দুই জায়গাতেই তাঁকে ব্যবহার করা হচ্ছে।

বাঁহাতি স্পিনার তানভীর ইসলাম নিয়েছেন ১০ উইকেট, ইকোনমি ৬.৭১। তাঁর সঙ্গে অফ স্পিনার মেহেদীর ৭ উইকেটের জুটি চট্টগ্রামের বড় শক্তি। নতুন বল থেকে পুরোনো বল—দুজনেই সমান কার্যকর।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন পাকিস্তানি অলরাউন্ডার আমের জামাল। পাঁচ ম্যাচে তাঁর উইকেট ১০টি। সহায়ক ভূমিকায় আছেন মুকিদুল ইসলাম, আবু হায়দার রনি ও হাসান নেওয়াজ। বড় নাম কম, কিন্তু কাজের ঘাটতি নেই।

ওপেনিংয়ে নির্ভরতার গল্প

ব্যাটিংয়ে চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় ভরসা ওপেনিং জুটি। টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহক অ্যাডাম রসিংটন খেলছেন চট্টগ্রামের হয়েই। ছয় ম্যাচে তিনটি ফিফটি ও একটি ৪৯ রানের ইনিংসে তাঁর সংগ্রহ ২৫৮ রান। স্ট্রাইক রেট ১৩৯.২৫।

নেপাল প্রিমিয়ার লিগের সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহককে দলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত চট্টগ্রামের জন্য কার্যত ‘মাস্টারস্ট্রোক’।

অন্য প্রান্তে আছেন মোহাম্মদ নাঈম। সাত ম্যাচে দুটি ফিফটিতে তাঁর রান ১৯৭, স্ট্রাইক রেট ১৩৫.৮৪। এই ডানহাতি–বাঁহাতি জুটি ছয় ইনিংসে দুটি শতরানের পার্টনারশিপ গড়েছে—যা চট্টগ্রামের ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড।

মিডল অর্ডারে মাহমুদুল হাসান, হাসান নেওয়াজ ও মেহেদীরা প্রয়োজন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছেন।

অলরাউন্ডার হিসেবে মেহেদীর পূর্ণতা

বোলিংয়ে মেহেদীর কার্যকারিতা নতুন কিছু নয়। এই টুর্নামেন্টে ৭ উইকেট, ইকোনমি ৬.৮৫—ধারাবাহিকতারই প্রতিচ্ছবি।

চমকটা এসেছে ব্যাট হাতে। পাঁচ ইনিংসে ১০১ রান, স্ট্রাইক রেট ১৬৮। প্রথম ম্যাচে ১৩ বলে ২৬, সিলেটের বিপক্ষে অপরাজিত ১৩ বলে ৩৩, রাজশাহীর বিপক্ষে লো-স্কোরিং ম্যাচে ২৮—প্রতিটাই ম্যাচের গতিপথে প্রভাব ফেলেছে।

মিডল ও লোয়ার অর্ডারে এসে গুরুত্বপূর্ণ রান, সঙ্গে দায়িত্বশীল অধিনায়কত্ব—মেহেদী এই চট্টগ্রামের পূর্ণাঙ্গ চালিকাশক্তি।

নির্ভার ড্রেসিংরুম

বিপিএলে পারিশ্রমিক জটিলতা নতুন নয়। তবে চট্টগ্রাম রয়্যালসের ক্ষেত্রে এবারের চিত্র আলাদা। বিসিবির তত্ত্বাবধানে থাকায় পারিশ্রমিক নিয়ে অনিশ্চয়তা নেই। মাঠের বাইরের চাপ কমে যাওয়ায় খেলোয়াড়েরা পুরো মনোযোগ দিতে পারছেন ক্রিকেটে।

এলোমেলো সূচনা, অল্প প্রস্তুতি—সব বাধা পেছনে ফেলে চট্টগ্রাম রয়্যালস দেখাচ্ছে, টি–টোয়েন্টিতে কখনো কখনো সবচেয়ে বড় শক্তি হয় পরিকল্পনার চেয়ে বিশ্বাস আর নির্ভার মানসিকতা।