Liton Das-Tawhid Hridoy-Tanzid Tamim-Nurul Hasan

টি–টোয়েন্টি ক্রিকেটে প্রস্তুতির সবচেয়ে বড় মঞ্চ হিসেবে বিবেচিত হয় ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলো। যেখানে ম্যাচ পরিস্থিতি, চাপ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা—সবকিছুই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের কাছাকাছি। সে কারণেই টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে বিপিএলকে দেখা হচ্ছিল বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের জন্য আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার সুযোগ হিসেবে। কিন্তু টুর্নামেন্টের অর্ধেক পথ পেরিয়ে সেই প্রত্যাশার জায়গায় এখন জমেছে কেবল দুশ্চিন্তা।

২০ ম্যাচ শেষে বিপিএলের চিত্রনাট্য বলছে, বিদেশি ক্রিকেটারদের আসা–যাওয়ার ভিড়ে টুর্নামেন্ট এগোলেও বাংলাদেশের বিশ্বকাপগামী ব্যাটসম্যানদের পারফরম্যান্স তেমন কোনো ভরসা জোগাতে পারছে না। বরং প্রশ্ন উঠছে—এই প্রস্তুতি কি আদৌ বিশ্বকাপের জন্য যথেষ্ট?

তারকাহীন বিপিএলে ভরসার অভাব

একই সময়ে একাধিক আন্তর্জাতিক ও ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ চলায় বিপিএলে এবার তারকার ঘাটতি স্পষ্ট। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের নিয়মিত জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের বড় অংশ নেই, নেই অনেক প্রথম সারির ইংলিশ ক্রিকেটারও। ফলে প্রতিযোগিতার মান তুলনামূলকভাবে মাঝারি। অথচ এই মানের বোলিং আক্রমণের বিপক্ষেও বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা নিয়মিত রান তুলতে পারছেন না—যেটা সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা।

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সামনে আসবে এমন সব বোলার, যারা গতির সঙ্গে সুইং, বাউন্স আর বৈচিত্র্য মিলিয়ে ব্যাটসম্যানদের পরীক্ষা নেবে প্রতিটি বলেই। সেই বাস্তবতায় বিপিএলের পারফরম্যান্সকে প্রস্তুতির মানদণ্ড ধরলে স্বস্তির জায়গা খুব সীমিত।

ওপেনিং জুটিতে ছন্দহীনতা

উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান তানজিদ হাসান তামিম সাম্প্রতিক সময়ে টি–টোয়েন্টিতে আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের জন্য পরিচিত। কিন্তু এবারের বিপিএলে সেই রূপ অনুপস্থিত। ছয় ইনিংসে রান ৮৭, ছক্কা মাত্র দুটি—পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে শুরুটা কতটা ধীর। রাজশাহী ওয়ারিয়র্স যে পরিকল্পনা নিয়ে তাকে দলে নিয়েছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন এখনো দেখা যায়নি।

তার সঙ্গে ওপেনিংয়ে থাকা সাইফ হাসানের অবস্থাও একই রকম। পাঁচ ম্যাচে মোট ৪৮ রান, একাধিক ইনিংসে এক অঙ্কের স্কোর—বিশ্বকাপের আগে একজন টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানের জন্য যা কোনোভাবেই আদর্শ নয়। ফর্মহীনতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানসিক চাপ, যা মাঠে তার ব্যাটিংয়ে স্পষ্ট।

সাইফ হাসানের ইনিংসগুলো এরকম—৪ বলে ১, ১৭ বলে ৯, ৪ বলে ১, ২৪ বলে ১৫ এবং ১৪ বলে ২২। এর মধ্যে প্রথম চারটি ইনিংসে ব্যর্থতার পর একাদশ থেকেও বাদ পড়েছিলেন। টি-টোয়েন্টি দলের সহ-অধিনায়কের এই দুরবস্থা বাড়তি দুশ্চিন্তার।

লিটনকে নিয়ে ধোঁয়াশা

রংপুর রাইডার্সে লিটন দাস খেলছেন ওপেনার হিসেবে। অথচ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাকে দেখা গেছে ওয়ানডাউনে কিংবা মিডল অর্ডারে বেশি কার্যকর হতে। বিপিএলে ছয় ম্যাচে ১২৯ রান করলেও ইনিংসগুলোর ধারাবাহিকতা নেই। শুরুটা ভালো হলেও দ্রুত আউট হয়ে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।

নতুন বলে সমস্যার কারণেই ওয়ানডে দলে জায়গা হারানো লিটনকে আবার পাওয়ার–প্লেতে নামানো কতটা যৌক্তিক—সেই প্রশ্ন উঠছে। কোচিং সিদ্ধান্ত আর খেলোয়াড়ের আত্মবিশ্বাসের মধ্যে যে ফারাক তৈরি হচ্ছে, সেটাও চোখে পড়ার মতো।

ইমন ছাড়া ব্যতিক্রম কম

এই চিত্রে ব্যতিক্রম পারভেজ হোসেন ইমন। আট ম্যাচে ২৩৬ রান করে তিনি শুধু পরিসংখ্যানেই এগিয়ে নন, তার ইনিংসগুলোর প্রভাব পড়েছে ম্যাচের ফলাফলেও। চার নম্বরে নেমে দায়িত্বশীল অথচ আক্রমণাত্মক ব্যাটিং—যেটা আধুনিক টি–টোয়েন্টিতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের মধ্যে তিনিই একমাত্র, যার ইনিংসগুলোকে নির্দ্বিধায় ‘ইমপ্যাক্ট ইনিংস’ বলা যায়।

মিডল অর্ডারে অস্বস্তি

তাওহীদ হৃদয়কে ঘিরে প্রত্যাশা ছিল অনেক। কিন্তু ছয় ম্যাচে ১০৬ রান, স্ট্রাইক–রেট ১১০-এর কাছাকাছি—এই পারফরম্যান্স বিশ্বকাপের আগে মিডল অর্ডারের জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। একটি হাফসেঞ্চুরি ছাড়া ইনিংসগুলো ছিল খণ্ডিত।

ফিনিশিং বিভাগেও সমস্যা স্পষ্ট। নুরুল হাসান সোহান মাঠে নামলেও চাপের মুহূর্তে ব্যাট হাতে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো ইনিংস দিতে পারেননি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দলের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেছে তার নামার আগেই।

মানসিকতার জায়গায় মূল প্রশ্ন

বিপিএলে বিদেশি অনেক ব্যাটসম্যানকে দেখে মনে হয়েছে, টি–টোয়েন্টিতে রান করা আসলে মানসিকতার খেলা। ঝুঁকি নেওয়ার সাহস আর পরিষ্কার পরিকল্পনাই পার্থক্য গড়ে দেয়। অথচ বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে এখনো নিরাপদ থাকার প্রবণতাই বেশি।

বিশ্বকাপের মঞ্চে সেই মানসিকতা নিয়ে টিকে থাকা কঠিন। বিপিএলের অর্ধেক পথ শেষে ব্যাটিং পারফরম্যান্স যা বলছে, তাতে সময় থাকতেই বড় প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে—নইলে প্রস্তুতির অভাবটাই হয়ে উঠবে সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ।