ব্রাজিলিয়ান প্রতিভা এস্তেভাও এখন চেলসির নায়ক।ব্রাজিলের আরেক প্রতিভা এস্তেভাও। ছবি: গেটি ইমেজেস

হিপের সামান্য দুলুনি, বলের ওপর আলতো ছোঁয়া, আর চোখের পলকে দিক পরিবর্তন—ডিফেন্ডার বুঝে ওঠার আগেই তিনি উধাও। স্ট্যামফোর্ড ব্রিজের গ্যালারিতে এখন এই দৃশ্যটি খুব পরিচিত। ১৮ বছর বয়সী এই তরুণ যখন বল পায়ে ছোটেন, মনে হয় কোনো এক শিল্পী ক্যানভাসে ছবি আঁকছেন। তিনি এস্তেভাও উইলিয়ান; যাকে খোদ নেইমার জুনিয়র তকমা দিয়েছেন ‘ব্রাজিলের পরবর্তী জিনিয়াস’ হিসেবে।

শৈশবের প্রথম ডিফেন্ডার যখন ‘রটউইলার’

সাও পাওলো থেকে ৪০০ কিলোমিটার দূরে ফ্রাঙ্কা শহরের এক ধূলিময় মাঠে শুরু হয়েছিল এই রূপকথা। মাত্র তিন বছর বয়সে ফুটবল স্কুলে ভর্তি হতে চেয়েছিলেন এস্তেভাও, যদিও নিয়ম ছিল পাঁচ বছরের। তাঁর প্রথম কোচ সার্জিও ফ্রেইতাস (সার্জিনহো) বল পায়ে এস্তেভাওকে দেখে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।

মজার ব্যাপার হলো, এস্তেভাওয়ের প্রথম ‘ডিফেন্ডার’ কোনো মানুষ ছিল না, ছিল তাদের পোষা রটউইলার কুকুর! সার্জিনহো স্মৃতিচারণ করে বলেন, “এস্তেভাও বল নিয়ে খেলত আর কুকুরটি সেটা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করত। সে কুকুরের বাধা এড়িয়ে ড্রিবলিং করত। একবার ভেবে দেখুন, একটা কুকুরের পা থেকে বল বাঁচিয়ে রাখা কতটা কঠিন!”

সেই অলৌকিক ভবিষ্যৎবাণী

এস্তেভাওয়ের জীবনের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে ধর্ম এবং পরিবার। তাঁর বাবা ইভো গনকালভেসের স্বপ্ন ছিল একটি গির্জা খোলার, কিন্তু সামর্থ্য ছিল না। ইভো জানান, একদিন গির্জায় প্রার্থনা করার সময় এক মেয়ে এসে তাঁকে বলেছিল, “আপনার ছেলেই আপনাকে আপনার গির্জা উপহার দেবে।”

তখন ইভো অবিবাহিত ছিলেন। বছর কয়েক পর যখন ছেলে জন্মাল, বাইবেলের দাউদ ও সুলায়মানের কাহিনী অনুসারে তিনি ছেলের নাম রাখলেন ‘এস্তেভাও’ (যার অর্থ মুকুট)।

নেইমারের সেই এক বার্তা এবং বদলে যাওয়া

২০২৫ সালের শুরুতে করিন্থিয়ান্সের বিপক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ পেনাল্টি মিস করে ভেঙে পড়েছিলেন এস্তেভাও। তখন তাঁর শৈশবের আদর্শ নেইমার ইনস্টাগ্রামে একটি বার্তা পাঠান। নেইমার লিখেছিলেন, “নিজের আত্মবিশ্বাস হারিও না, ক্যারিয়ারে আরও অনেক পেনাল্টি মিস করবে। এটাই খেলার অংশ। আসল হলো তুমি কীভাবে ঘুরে দাঁড়াও।”

বার্তার শেষে নেইমার তাঁকে ‘ব্রাজিলের পরবর্তী জিনিয়াস’ বলে অভিহিত করেন। এই এক বার্তাই বদলে দেয় তরুণ এস্তেভাওকে।

পড়ুন আরও: ‘এস্তেভাও অবিশ্বাস্য প্রতিভা, ব্রাজিলের ভবিষ্যত’

চেলসিতে আগমন ও ইয়ামালকে ছাঁপিয়ে যাওয়া

চেলসিতে যোগ দেওয়ার আগে থিয়াগো সিলভার পরামর্শ নিয়েছিলেন এস্তেভাও। প্রিমিয়ার লিগের ২০২৫-২৬ মৌসুমে লিভারপুলের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের জয়সূচক গোল করে নিজের জাত চেনান তিনি। তবে তাঁর ক্যারিয়ারের এখন পর্যন্ত সেরা মুহূর্তটি এসেছে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে বার্সেলোনার বিপক্ষে।

লামিন ইয়ামাল বনাম এস্তেভাও—দুই বিস্ময়বালকের লড়াইয়ে সেদিন আলো কেড়ে নিয়েছিলেন এই ব্রাজিলিয়ানই। রিস জেমসের পাস থেকে বল পেয়ে আলেজান্দ্রো বালদেকে ঘোল খাইয়ে যখন বল জালে জড়ালেন, ফুটবল বিশ্ব নতুন এক রাজার আগমনী বার্তা পেল।

কেন তিনি আলাদা?

এস্তেভাওয়ের বিশেষত্ব হলো তাঁর হাসিমুখ। হাজার হাজার দর্শকের সামনেও তিনি এমনভাবে খেলেন যেন পাড়ার মাঠে বন্ধুদের সাথে মজা করছেন। তাঁর বাবা সবসময় একটি কথা বলতেন—“দায়িত্ব পালন করো আনন্দের সাথে।” এই আনন্দই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।

আজ ব্রাজিলের সেই ‘তোক দে বোলা’ একাডেমির দেয়ালে এস্তেভাওয়ের বিশাল ছবি ঝোলানো থাকে, যা নতুন প্রজন্মের কাছে প্রেরণার নাম।