ক্রিকফুট এক্সপ্লেইনার
ইউরোপের মাটিতে ফ্র্যাঞ্চাইজি ভিত্তিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট—শোনাতে যতটা নতুন, বাস্তবে ততটাই দীর্ঘ প্রতীক্ষার ফল। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটাতে চলেছে ইউরোপিয়ান টি-টোয়েন্টি প্রিমিয়ার লিগ (ইটিপিএল)। চলতি বছরের শেষ দিকে আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের শহরভিত্তিক দল নিয়ে শুরু হতে যাচ্ছে ছয় দলের এই পুরুষদের টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট।
লিগটি প্রথমে ২০২৫ সালে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও, ফ্র্যাঞ্চাইজি বিক্রি চূড়ান্ত না হওয়ায় সূচি পিছিয়ে যায়। তবে সেই অনিশ্চয়তা কাটিয়ে উঠেছে ETPL। ইতোমধ্যে তিনটি ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকানা চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে, যার বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছেন অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের সাবেক তারকা ক্রিকেটার এবং ক্রীড়া উদ্যোক্তারা। এই তালিকার সবচেয়ে আলোচিত নাম সাবেক অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহ।
ওয়াহ নেতৃত্ব দিচ্ছেন নেদারল্যান্ডসভিত্তিক দল আমস্টারডাম ফ্লেমসের বিনিয়োগ গোষ্ঠীকে। এই কনসোর্টিয়ামে আছেন সাবেক অস্ট্রেলিয়ান ফিল্ড হকি তারকা জেমি ডোয়ার এবং ব্যবসায়ী টিম থমাস। ফ্র্যাঞ্চাইজিটি ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের দুই বড় নাম—স্টিভ স্মিথ ও মিচেল মার্শকে বিদেশি খেলোয়াড় হিসেবে চুক্তিবদ্ধ করেছে, যা লিগটির উচ্চাকাঙ্ক্ষার স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে।
স্টিভ ওয়াহ প্রকাশ্যেই জানিয়েছেন, ইউরোপে ক্রিকেটের বিস্তারে তিনি এই প্রকল্পকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাঁর ভাষায়, এটি কোনো প্রদর্শনীমূলক আয়োজন নয়; বরং প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই একটি লিগ গড়ার চেষ্টা।
বিনিয়োগ, সূচি ও আইসিসির অনুমোদন—কীভাবে দাঁড়াচ্ছে লিগটি
ইটিপিএল শুধুই একটি নতুন টুর্নামেন্ট নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনার অংশ। জানা গেছে, ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো ১০ বছরের জন্য প্রায় দেড় কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থে বিক্রি হয়েছে। প্রতিটি দলের মৌসুমি খেলোয়াড় বাজেট ধরা হয়েছে আনুমানিক ১৫ লাখ ডলার, যা ইউরোপের প্রেক্ষাপটে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ।
লিগের প্রথম আসর শুরু হওয়ার কথা আগামী ২৬ আগস্ট। আয়োজনে সরাসরি যুক্ত রয়েছে আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের ক্রিকেট বোর্ড। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই টুর্নামেন্ট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পেয়েছে। আইসিসির দৃষ্টিতে, ইউরোপে ক্রিকেটের কাঠামোগত উন্নয়নে এই লিগ একটি কার্যকর ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
বলিউড অভিনেতা ও প্রযোজক অভিষেক বচ্চনও এই লিগের অংশীদার। একটি ভারতীয় ক্রীড়া প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি বিনিয়োগ করেছেন। তাঁর মতে, খেলোয়াড়দের মান, সম্প্রচার ও ব্যবস্থাপনা—সব দিক থেকেই এই লিগ আন্তর্জাতিক মানের হতে যাচ্ছে।
ইতোমধ্যে বেলফাস্ট ও এডিনবরাভিত্তিক দুটি ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকানা চূড়ান্ত হয়েছে। বেলফাস্ট দলের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আছেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল ও তাঁর ভাই ড্যানিয়েল ম্যাক্সওয়েল। এডিনবরা দলের পেছনে রয়েছে নিউজিল্যান্ডের একটি কনসোর্টিয়াম, যেখানে সাবেক ব্ল্যাক ক্যাপস ক্রিকেটার কাইল মিলস ও নাথান ম্যাককালামের ভূমিকা মুখ্য।
খেলোয়াড় পাওয়া যাবে তো?
ইটিপিএলের সময়সূচি নিয়ে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও আছে। এই সময় ইংল্যান্ডের টেস্ট সিরিজ, ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগ ও কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপের সঙ্গে সূচির সংঘর্ষ হচ্ছে। ফলে সব বড় তারকাকে পাওয়া সহজ হবে না। তবে সাদা বলের চুক্তিতে থাকা ইংলিশ ক্রিকেটাররা প্রয়োজনীয় অনুমতি পেলে, এই লিগে খেলার সুযোগ পাবেন।
লিগ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিটি দলে অন্তত সাতজন ইউরোপীয় ক্রিকেটার রাখতে হবে। মূলত আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের খেলোয়াড়রাই সুযোগ পাবেন, তবে অন্য সহযোগী দেশগুলোর ক্রিকেটারদের জন্যও দরজা খোলা থাকবে।
ইউরোপে আগেও ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ চালুর চেষ্টা হয়েছে, যা নানা কারণে ব্যর্থ হয়েছে। আবহাওয়া, স্থায়ী ভেন্যুর অভাব এবং বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে সংশয় এখনো পুরোপুরি কাটেনি। তবু সংশ্লিষ্ট বোর্ডগুলোর মতে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এগিয়ে যেতে হলে এই ঝুঁকি নেওয়াই এখন সময়ের দাবি।
সবকিছু ঠিকঠাক চললে, ইটিপিএল ইউরোপীয় ক্রিকেটের জন্য হতে পারে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

