ম্যানসিটি তারকা আর্লিং হালান্ডম্যানচেস্টার সিটির তারকা আর্লিং হালান্ড। ছবি: গেটি ইমেজেস

মৌসুমের শুরুটা ছিল ঝড়ের মতো। গোলের পর গোল, রেকর্ডের পর রেকর্ড—আর্লিং হালান্ড যেন অপ্রতিরোধ্যই ছিলেন। কিন্তু সেই গতিতে হঠাৎ করেই যেন ছন্দপতন। পরিসংখ্যান বলছে, সময়টা ভালো যাচ্ছে না ম্যানচেস্টার সিটির এই নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকারের।

এ মৌসুমে ক্লব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ৩৬ ম্যাচে ৩৯ গোল—সংখ্যাটা এখনও ঈর্ষণীয়। তবে সাম্প্রতিক আট ম্যাচে তাঁর গোল মাত্র একটি, তাও পেনাল্টি থেকে! ওপেন প্লে থেকে গোল নেই এক মাসেরও বেশি সময় ধরে। অবিশ্বাস্য লাগছে না?

এই গোলখরার মধ্যেই প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা দৌড়ে গতি হারিয়েছে সিটি। চ্যাম্পিয়নস লিগে বোদো/গ্লিমটের কাছে হারের ধাক্কাও এসেছে একই সময়ে। ম্যানচেস্টার ডার্বিতে হারের পর কোচ পেপ গার্দিওলা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, দলে শক্তির ঘাটতি স্পষ্ট।

তাহলে প্রশ্নটা উঠছেই—২৫ বছর বয়সী হালান্ড কি এই মৌসুমে খুব বেশি ম্যাচ খেলছেন?

‘সব দায় আমার’—হালান্ডের স্বীকারোক্তি

বোদো/গ্লিমটের বিপক্ষে আর্কটিক সার্কেলে ঠান্ডা আর হতাশার রাতে গোলের সুবর্ণ সুযোগ নষ্ট করেন হালান্ড। ৮ গজ দূর থেকে নেওয়া প্রথম শটটি লক্ষ্যের বাইরে চলে যায়—যে সুযোগ মৌসুমের শুরুতে তিনি প্রায় নিশ্চিতভাবেই কাজে লাগাতেন।

ম্যাচ শেষে TNT Sports-কে হতাশ হালান্ড বলেন, “আমার কাছে কোনো উত্তর নেই। যে গোলগুলো করা উচিত ছিল, তা না পারার পুরো দায়িত্ব আমি নিচ্ছি। আজ যারা ম্যানচেস্টার সিটিকে সমর্থন করতে এসেছিলেন, তাঁদের সবার কাছে আমি দুঃখিত।”

অতিরিক্ত ম্যাচ খেলার প্রসঙ্গেও কথা বলেন তিনি।

“আমি কেমন অনুভব করছি, সেটা বলতে চাই না। মাঠে নামলে আমি সব সময় আমার সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করি। আমরা হাস্যকর রকমের অনেক ম্যাচ খেলছি। এটা আমার কাজ, আর আমি পরের ম্যাচের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার চেষ্টা করছি।”

পরিসংখ্যানে ক্লান্তির ছাপ

চলতি মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে হালান্ড খেলেছেন ৩১টি ম্যাচ, মাঠে ছিলেন ২ হাজার ৫৬৮ মিনিট। প্রিমিয়ার লিগের খেলোয়াড়দের মধ্যে মাঠে কাটানো সময়ের হিসেবে তিনি ১২তম।

তবে ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের ফরোয়ার্ডদের মধ্যে তাঁর অবস্থান দ্বিতীয়—ক্রিস্টাল প্যালেসের জঁ-ফিলিপ মাতেতার পরেই। মাতেতা দুটি ম্যাচ বেশি খেললেও সময়ের ব্যবধান মাত্র ৫২ মিনিট।

এখনও লিগে বাকি ১৬ ম্যাচ। সঙ্গে আছে কারাবাও কাপ, এফএ কাপ ও চ্যাম্পিয়নস লিগের সম্ভাব্য ফাইনাল পথ। মার্চে নরওয়ের দুটি প্রীতি ম্যাচও রয়েছে। সব মিলিয়ে, বিশ্বকাপ শুরুর আগে ক্লাব ও দেশের হয়ে হালান্ডের ম্যাচসংখ্যা পৌঁছাতে পারে ৬৯-এ।

আক্রমণাত্মক পরিসংখ্যানেও পতন

ওয়েস্ট হ্যামের বিপক্ষে শেষবার ওপেন প্লে থেকে গোল করার পর হালান্ডের আক্রমণাত্মক সূচকে স্পষ্ট পতন দেখা যাচ্ছে। প্রতি ৯০ মিনিটে শট নেওয়ার সংখ্যা কমেছে, প্রতিপক্ষ বক্সে স্পর্শ নেমেছে ৬.৭ থেকে ৪.৩-এ। প্রত্যাশিত গোল (xG) কমে দাঁড়িয়েছে ০.৪২—আগে যা ছিল ০.৯৮।

বড় সুযোগ পাওয়ার হারও কমেছে প্রায় অর্ধেকে। এ ছাড়া রুবেন দিয়াস ও যোস্কো গভার্দিওলের চোট, দীর্ঘ বিরতির পর রদ্রির ফেরা এবং ওয়েস্ট হ্যাম ম্যাচের পর থেকে ফিল ফোডেনের গোল–অ্যাসিস্ট শূন্য—সব মিলিয়ে সিটির আক্রমণেও প্রভাব পড়েছে।

গার্দিওলার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন

হালান্ড নিজে দায় নিলেও প্রশ্ন উঠছে কোচ পেপ গার্দিওলার সিদ্ধান্ত নিয়েও। লিগ ওয়ানের এক্সেটার সিটির বিপক্ষে ১০–১ গোলের এফএ কাপ জয়ের ম্যাচে তাঁকে ৪৫ মিনিট খেলানো ছিল বিস্ময়কর সিদ্ধান্ত। সে ম্যাচে তরুণ ডিভাইন মুকাসাকে সুযোগ দেওয়া যেত বলেই মনে করেন অনেকেই।

তবে নভেম্বরে চ্যাম্পিয়নস লিগে বায়ার লেভারকুসেনের বিপক্ষে একসঙ্গে ১০টি পরিবর্তন করে হারের অভিজ্ঞতা গার্দিওলাকে সতর্ক করেছে।

ইতিবাচক দিক হলো, আফ্রিকা কাপ অব নেশনস শেষে ওমর মারমুশ ফিরেছেন। জানুয়ারিতে দলে যোগ দেওয়া অ্যান্টনি আঁতোয়ান সেমেনিও সামনে একাধিক পজিশনে খেলতে পারেন। ফলে গোলের পুরো বোঝা হয়তো আর একা হালান্ডের কাঁধে থাকবে না।

‘ও আবার ফিরবে’

সমালোচনার মাঝেও আর্লিং হালান্ডের উপর থেকে আস্থা হারাচ্ছেন না সাবেকরা। বিবিসি রেডিও ফাইভ লাইভে সাবেক প্রিমিয়ার লিগ স্ট্রাইকার ক্রিস সাটন বলেন, “সে এমন একজন ফরোয়ার্ড, যে প্রায় সব সময়ই গোল করেছে। সে আবার ফিরবে। যারা এখনই তাকে বাতিল করে দিতে চায়, তাদের সতর্ক থাকা উচিত।”

ফর্ম সাময়িক হারালেও, ইতিহাস বলছে—আর্লিং হালান্ডকে লিখে ফেলা কখনোই সহজ নয়!