Football Village Nordash Rajshahi Cricfoot24নরদাস গ্রামে জমজমাট ফুটবল। ছবি: সংগৃহিত

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার নরদাস গ্রামে গেলে প্রথমেই চোখে পড়ে মানুষের ভিড়। কিন্তু সেটা হাটে নয়, মাঠে। এখানে দিনের শুরু হয় মাঠের দিকে তাকিয়ে, আর দিনের শেষও মাঠ ঘিরেই। গ্রামের মানুষ জানেন—আজ খেলাই আসল আয়োজন।

নরদাস গ্রামকে তাই আলাদা করে পরিচয় করাতে হয় না। বছরের পর বছর ধরে এটি পরিচিত হয়ে উঠেছে ‘ফুটবলের গ্রাম’ নামে। মাঠে খেলোয়াড়দের দৌড়, গ্যালারিতে দর্শকের উত্তেজনা, আর চারপাশে মানুষের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে ফুটবল এখানে কেবল খেলা নয়, জীবনের অংশ।

চার দশকের ফুটবলচর্চা

নরদাসে ফুটবলের শেকড় গেঁথে যায় আশির দশকের শুরুতে। ১৯৮০ সালের দিকে এখানে গড়ে ওঠে ‘বঙ্গবীর’ নামে একটি ফুটবল দল। স্থানীয় পর্যায়ে দলটির সাফল্য দ্রুতই গ্রামজুড়ে ফুটবলের প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে তোলে। তখন থেকেই নিয়মিত খেলাধুলার আয়োজন শুরু হয়।

সাবেক ফুটবলার রেজাউল হক পিন্টু বলেন-

“নরদাস মাঠের ফুটবল একটা ঐতিহ্য। বঙ্গবীর দলের সময় থেকেই নিয়মিত খেলা হচ্ছে। সেই ধারা আজও থামেনি। আমি নিজে প্রায় ২০ বছর এখানে খেলেছি।”

টিকিট কেটে খেলা দেখার গ্রাম

নরদাসে ফুটবল ম্যাচ মানেই উৎসব। সাম্প্রতিক একটি ম্যাচেই তার প্রমাণ মিলেছে। রাজশাহী ও দিনাজপুর জেলা দলের ম্যাচ দেখতে মাঠের চারপাশে দুই সারিতে বসানো হয়েছিল প্রায় দুই হাজার চেয়ার। খেলা শুরুর আগেই সব আসন পূর্ণ হয়ে যায়।

প্রথম সারিতে বসে খেলা দেখতে টিকিটের দাম ছিল ৭০ টাকা, দ্বিতীয় সারিতে ৪০ টাকা। দাঁড়িয়ে খেলা দেখার সুযোগ ছিল বিনা মূল্যে। কিন্তু তাতেও জায়গা পাওয়া সহজ ছিল না। কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ ছাদে, কেউ আবার গাছের ডালে উঠে ম্যাচ উপভোগ করেছেন।

মাঠে বাজে গান, ওঠে শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনা

খেলার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাজছিল ব্যান্ড দলের বাদ্যযন্ত্র। একসময় দিনাজপুর দলের একটি শট বারপোস্টে লেগে ফিরে এলে মাঠজুড়ে হতাশার শব্দ। ঠিক তখনই পাল্টা আক্রমণে রাজশাহীর গোল—আর সঙ্গে সঙ্গে গর্জে ওঠে গ্যালারি।

এই আবহেই মাছচাষি আব্দুস সামাদ নাতিকে কোলে নিয়ে বসেছিলেন দর্শক সারিতে। তিনি বলেন, “আমরা ফুটবল ভালোবাসি। বাড়ির সবাই খেলাধুলা করে। আজ পাঁচজন এসেছি, টিকিট কেটেই খেলা দেখছি।”

মাদকবিরোধী বার্তাও মাঠ থেকে

নরদাস ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রফিক জানান, ফুটবলকে সামাজিক বার্তার মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করা হয়।

“‘মাদক ছেড়ে মাঠে চল’—এই স্লোগানে এখানে ফুটবল হয়। এবারের টুর্নামেন্টটি আরাফাত রহমান কোকোর নামে। সব মতের মানুষ এখানে একসঙ্গে মাঠে আসে।”

একাডেমি, ধারাভাষ্য আর জাতীয় পর্যায়ের ছোঁয়া

গ্রামের কলেজশিক্ষক আব্দুস সালাম শিমুল ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত আছেন ভিন্নভাবে। সাবেক ফুটবলার শিমুল এখন ধারাভাষ্যকার। পাশাপাশি গড়ে তুলেছেন নরদাস ফুটবল একাডেমি।

তিনি বলেন, “এই মাঠে জাতীয় দলের অনেক খেলোয়াড় খেলেছেন। এবার বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের মানিক হোসেন মোল্লা, নেহাল, আশিক খেলেছে। আমি খেলোয়াড় ছিলাম, এখন ধারাভাষ্য দিই। মানুষ এটা উপভোগ করে।”

দলমতের ঊর্ধ্বে ফুটবল

খেলার উদ্বোধনে এসে রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনের বিএনপি মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী ডিএমডি জিয়াউর রহমান বলেন,

“নরদাসের ফুটবলের আলাদা ঐতিহ্য আছে। এখানে ফুটবল দলমতের ঊর্ধ্বে। তাই রাজনৈতিক ব্যস্ততা থাকলেও খেলায় আসতেই হয়।”

ভালোবাসার নাম নরদাস

নরদাসে ফুটবল মাঠ শুধু কংক্রিট বা ঘাসের জায়গা নয়। এটি গ্রামকে এক করে রাখার কেন্দ্র। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এখানে শিখেছে—হারজিতের চেয়েও বড় বিষয় একসঙ্গে থাকা।

এই কারণেই নরদাস আজ শুধু একটি গ্রাম নয়। এটি বাংলাদেশের ফুটবল ভালোবাসার এক জীবন্ত প্রতীক।