Messi and Yamal

ফুটবল ইতিহাসে কিছু বয়স থাকে, যেগুলো শুধু সংখ্যা নয়—একটা প্রেক্ষাপট। ১৮ বছর বয়সে কারও কাঁধে যদি বার্সেলোনা ও স্পেন জাতীয় দলের নিয়মিত জার্সি থাকে, তাহলে সেটি আর প্রতিভার গল্প থাকে না, হয়ে ওঠে দায়িত্বের গল্প। লামিনে ইয়ামালের ক্যারিয়ার এখন ঠিক সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে।

মাত্র ১৮ বছর বয়সেই বার্সেলোনা ও স্পেনের হয়ে ১৫০ ম্যাচ। আধুনিক ফুটবলে এমন নজির হাতে গোনা। এই পথচলা শুধু অল্প বয়সে বড় মঞ্চে ওঠার নয়, বরং বড় মঞ্চে নিয়মিত পারফর্ম করে নিজের জায়গা পোক্ত করার। সেখানেই ইয়ামাল আলাদা। সে কারণেই তাঁর নামের পাশে অনিবার্যভাবে চলে আসে আরেকটি নাম—লিওনেল মেসি।

তুলনাটা নতুন নয়, অস্বস্তিকরও নয়। কারণ দুজনের শিকড় একই জায়গায়—লা মাসিয়া। মেসি যেমন এই একাডেমি থেকে উঠে এসে বার্সেলোনার ইতিহাস বদলে দিয়েছিলেন, ইয়ামালও সেই পথেই হাঁটছেন। তবে দুজনের সময়, বাস্তবতা ও প্রত্যাশার ভার এক নয়।

বয়সই প্রথম পার্থক্য

মেসি যখন ক্যারিয়ারের ১৫০তম ম্যাচ খেলেন, তখন তাঁর বয়স ২১। সে সময় মেসি ধীরে ধীরে বার্সেলোনার আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছেন। ইয়ামালের ক্ষেত্রে ছবিটা উল্টো। ১৮ বছরেই তিনি দলের আক্রমণভাগের নিয়মিত অংশ, অনেক ম্যাচেই মূল ভরসা।

এই বয়সের ব্যবধানটাই তুলনাটাকে আরও বিস্ময়কর করে তোলে। মেসি ১৮ বছরে ছিলেন সম্ভাবনার প্রতিশ্রুতি, ইয়ামাল ১৮ বছরেই বাস্তবতার নাম।

সংখ্যায় কারা এগিয়ে

১৫০ ম্যাচ শেষে গোলের হিসাবে মেসি এগিয়ে। আর্জেন্টাইন কিংবদন্তির গোল ছিল ৫৮টি, ইয়ামালের ৪০। তবে খেলায় প্রভাব শুধু গোল দিয়ে মাপা যায় না—আক্রমণ গড়ার ভূমিকা, শেষ পাসের দায়িত্ব, খেলার ছন্দ বদলানোর ক্ষমতা—এসব জায়গায় ইয়ামাল শুরু থেকেই বড় ভূমিকা রেখে চলেছেন।

এই জায়গাতেই অ্যাসিস্টের পরিসংখ্যানে ইয়ামাল এগিয়ে। প্রথম ১৫০ ম্যাচে তাঁর অ্যাসিস্ট ৫৭টি, যেখানে মেসির ছিল ৩১। গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে মোট অবদানে ইয়ামালের সংখ্যা দাঁড়ায় ৯৭, মেসির ছিল ৮৯।

মিনিটের হিসাবেও ব্যবধান সামান্য। ইয়ামাল প্রতি প্রায় ১১৩ মিনিটে একটি গোল বা অ্যাসিস্টে যুক্ত হয়েছেন, মেসি করতেন প্রতি প্রায় ১১৫ মিনিটে।

প্রথম ১৫০ ম্যাচে ইয়ামাল ও মেসি

ম্যাচ: ইয়ামাল ১৫০ | মেসি ১৫০

গোল: ইয়ামাল ৪০ | মেসি ৫৮

অ্যাসিস্ট: ইয়ামাল ৫৭ | মেসি ৩১

মোট গোলে অবদান: ইয়ামাল ৯৭ | মেসি ৮৯

পেনাল্টি গোল: ইয়ামাল ৪ | মেসি ৮

মিনিট/গোল–অ্যাসিস্ট: ইয়ামাল ১১২.৮ | মেসি ১১৪.৭

সংখ্যার বাইরের গল্প

তবে ফুটবল শুধু সংখ্যার খেলা নয়। মেসির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল ধারাবাহিকতা—এক মৌসুম নয়, এক দশক ধরে একই মান ধরে রাখা। ইয়ামালের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সেখানেই।

আজকের ফুটবলে চাপ, মিডিয়া নজর, সোশ্যাল মিডিয়ার প্রত্যাশা—সবকিছু মিলিয়ে তরুণদের পথ আরও কঠিন। ইয়ামাল নিজেও বারবার বলেছেন, তিনি মেসির সঙ্গে তুলনায় যেতে চান না, নিজের আলাদা পরিচয় গড়তে চান। এই মানসিকতা তাঁর জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিতই দেয়।

ভবিষ্যৎ কী বলছে

ইয়ামাল এখন যে পর্যায়ে আছেন, সেখানে তাঁর ক্যারিয়ারকে ‘মেসির উত্তরসূরি’ বলে বেঁধে দেওয়া অন্যায়। মেসি ছিলেন ব্যতিক্রমের ব্যতিক্রম। ইয়ামালের গল্পটা আলাদা হতে পারে, আলাদা হওয়াই স্বাভাবিক।

তবে এটুকু নিশ্চিত—এত অল্প বয়সে এত বড় মঞ্চে এমন প্রভাব খুব কম ফুটবলারই রাখতে পেরেছেন। ইয়ামাল যদি নিজের শরীর, মন আর খেলাকে একই ছন্দে রাখতে পারেন, তাহলে ভবিষ্যৎ ফুটবল তার জন্য বড় কিছুই লিখে রেখেছে।

সময়ই ঠিক করবে, তিনি কোথায় পৌঁছাবেন। আপাতত ফুটবল বিশ্ব দেখছে—এক রাজপুত্র ধীরে ধীরে নিজের রাজত্ব গড়ার পথে হাঁটছে।