ড্র হয়েছে মোহামেডান-কিংস ম্যাচ।

নাম বদলে করা হয়েছে বাংলাদেশ ফুটবল লিগ। আধুনিকতার স্বপ্ন দেখানো এই লিগে বাস্তব চিত্রটা ঠিক উল্টো। অর্ধেক পথ পেরিয়ে গেলেও কোনো টেলিভিশনে এখনও দেখা যায়নি খেলার সম্প্রচার। মাঠের বাইরের চিত্র আরও হতাশাজনক।

তারিক কাজীর পর যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী কিউবা মিচেল বসুন্ধরা কিংস ছেড়ে যাওয়ায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে ঘরোয়া ফুটবলের শীর্ষ প্রতিযোগিতার রুগ্‌ণ দশা। দুজনই ক্লাব ছাড়ার কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন পাওনা না পাওয়া। এতে ক্লাবগুলোর পেশাদারিত্ব নিয়েই বড় প্রশ্ন উঠেছে।

লিগের প্রথম পর্ব শেষ হলেও ফুটবলারদের অর্থকষ্ট কাটেনি। মধ্যবর্তী দলবদলের ছুটিতে গিয়েও অনেক খেলোয়াড়ের মুখে হাসি নেই। কারণ, টাকা ছাড়াই তাদের বিদায় দিয়েছে ক্লাব কর্তারা। পাওনা নিয়ে গড়িমসি চললেও বাফুফের পক্ষ থেকে নেই কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ।

যাদের এগিয়ে আসার কথা, সেই ফুটবল খেলোয়াড় কল্যাণ সমিতির ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে। ফুটবলারদের সমস্যা সমাধানে সংগঠনটি যেন নীরব দর্শক।

চুক্তির ক্ষেত্রেও ছলচাতুরির অভিযোগ আছে একাধিক ক্লাবের বিরুদ্ধে। অনেক ক্ষেত্রেই চুক্তিপত্রের কপি ফুটবলারদের দেওয়া হয় না। ফলে পাওনা চাইতে গেলে উল্টো হুমকির মুখে পড়তে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ভয়েই অনেকে মুখ খুলতে চান না।

এবারের পরিস্থিতিতে হতাশ ফুটবলারদের মধ্যে ঠিকানা বদলের চিন্তাও দেখা দিয়েছে। টাকা না পেলে দ্বিতীয় লেগে না খেলার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন কেউ কেউ।

এক ফুটবলার নিজের হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘টাকা পাইনি, মুখে তো আর হাসি থাকার কথা নয়। আমি এর আগে কখনও এমনটা দেখিনি। মাঝে মাঝে মনে হয় নিজের ওপরই দায় দেই যে কেন ফুটবল খেলতে এসেছি। জাতীয় দলের খেলোয়াড় হয়ে আমাদেরই এই অবস্থা, অন্যদের অবস্থা আরও খারাপ। যদি পেমেন্ট না পাই, তাহলে দ্বিতীয় লেগে না-ও খেলতে পারি।’

১০ দলের লিগে একমাত্র ফর্টিস ফুটবল ক্লাব ছাড়া আর কোনো দলই নিয়মিত পারিশ্রমিক দিচ্ছে না বলে অভিযোগ ফুটবলারদের। অথচ বেতন সমস্যার সমাধানে বাফুফের কেউই এগিয়ে আসেননি। পেশাদার লিগ কমিটির চেয়ারম্যান ইমরুল হাসানও এ বিষয়ে নীরব। বসুন্ধরা কিংসের সভাপতি হিসেবে তিনিও নিজের ক্লাবের বেতন সমস্যা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন।

ফুটবল খেলোয়াড় কল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকেও নেই কার্যকর কোনো ভূমিকা। অভিযোগ না পাওয়ার কথা বলে দায় এড়াচ্ছেন সংগঠনটির সভাপতি ইকবাল হোসেন।

তিনি বলেন, ‘ফুটবলাররা তো বেতন নিয়ে আমাদের সেভাবে কখনও জানায়নি। যদি ফুটবলাররা এসে বলে যে আমরা টাকা পাচ্ছি না, তখন আমরা ক্লাবগুলোর সঙ্গে কথা বলব। প্রয়োজনে আমরা ফেডারেশনে সভাপতির সঙ্গে কথা বলব।’

অথচ মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব যে খেলোয়াড়দের বেতন দিতে পারছে না, সেটা ফুটবল অঙ্গনে ওপেন সিক্রেট। একপর্যায়ে ম্যাচ বয়কটের কথাও ভেবেছিলেন ফুটবলাররা। তখনও পাশে দাঁড়ায়নি খেলোয়াড় কল্যাণ সমিতি।

এ প্রসঙ্গে ইকবাল হোসেন বলেন, ‘আমরা এখনও মোহামেডানের সঙ্গে বসিনি। চিন্তা করছি বসব।’

মাঠের পারফরম্যান্সে অবশ্য ব্যতিক্রম ফর্টিস এফসি। নবম রাউন্ড শেষে ১৮ পয়েন্ট নিয়ে বসুন্ধরা কিংসের সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে আছে তারা। পারিশ্রমিক দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্যদের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে ফর্টিস। বেতনের পাশাপাশি পারফরম্যান্স বোনাসও পাচ্ছেন খেলোয়াড়রা।

ক্লাবের সাফল্যের পেছনের গল্প জানিয়ে ফর্টিস এফসির ম্যানেজার রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফরা দুর্দান্ত কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের দুর্দান্ত কাজের অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছেন ফর্টিস গ্রুপের এমডি ও ক্লাবের প্রেসিডেন্ট। ক্লাবের প্রতিটি সদস্যের আর্থিক নিরাপত্তার বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পেরেছেন তারা।’

“ক্লাবের কর্ণধাররা তাদের কমিটমেন্ট রক্ষা করায় খেলোয়াড়রা নিজেদের সর্বোচ্চ উজাড় করে দিতে পারেন। যার প্রতিচ্ছবি পয়েন্ট টেবিল।”

নামে আধুনিক হলেও বাস্তবে বাংলাদেশ ফুটবল লিগ এখনো পুরোনো সংকটেই বন্দী। মাঠের লড়াই যতটা চোখে পড়ে, তার চেয়েও বেশি চাপা পড়ে যায় ফুটবলারদের নীরব দীর্ঘশ্বাস।