ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে সময় খুব দ্রুত বদলে যায়। মাত্র ১১ সপ্তাহ আগেও ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ব্রাইটনকে হারিয়ে টানা তৃতীয় জয়ের পর মনে হয়েছিল—রুবেন আমোরিমের অধীনে হয়তো ঘুরে দাঁড়াচ্ছে ক্লাবটি। কিন্তু সময়ের চাকা ঘুরতে ঘুরতেই দৃশ্যপট পুরো বদলে গেছে।
রোববার এফএ কাপের তৃতীয় রাউন্ডে ব্রাইটনের বিপক্ষে হার শুধু একটি ম্যাচ হারের গল্প নয়, বরং ইউনাইটেডের বর্তমান বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে নেমে আসা ধূসর আকাশ আর টানা বৃষ্টি যেন এই ক্লাবের ভেতরের অস্থিরতাকেই রূপক হয়ে তুলে ধরেছে।
এই পরাজয়ের মধ্য দিয়ে এক অস্বস্তিকর ইতিহাসে নাম লিখিয়েছে ইউনাইটেড। ১৯৮১–৮২ মৌসুমের পর প্রথমবার তারা দুইটি ঘরোয়া কাপ প্রতিযোগিতাতেই প্রথম ধাপে বিদায় নিল। ফলে চলতি মৌসুমে ইউনাইটেডের ম্যাচ সংখ্যা দাঁড়াবে মাত্র ৪০-এ—যা ১৯১৪–১৫ মৌসুমের পর সবচেয়ে কম।
সে সময়ের কথা আজ স্মৃতির বাইরে। এমনকি বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক মানুষ, ১১৬ বছর বয়সী এথেল ক্যাথারহ্যাম তখন মাত্র পাঁচ বছরের শিশু।
মৌসুমের শেষে অর্থনৈতিক ঘাটতি সামাল দিতে গত বছর এশিয়া সফরে যেতে হয়েছিল ইউনাইটেডকে। এবার বাস্তবতা আরও কঠিন। ফেব্রুয়ারি-মার্চে এফএ কাপের ফাঁকা সূচির কারণে সৌদি আরবে মধ্য-মৌসুম সফরের সম্ভাবনাও জোরালো হচ্ছে।
এর আগেই অবশ্য বড় পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। আগামী শনিবার ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে মাঠে নামবে ইউনাইটেড—কিন্তু কোনো স্থায়ী কোচ ছাড়াই। দলের আত্মবিশ্বাস এই মুহূর্তে ভঙ্গুর। শেষ সাত ম্যাচে মাত্র একটি জয়, সেটিও ২৬ ডিসেম্বর নিউক্যাসলের বিপক্ষে কিছুটা সৌভাগ্য সহায় হয়ে।
ব্রাইটনের আগের সফরের পর থেকে খেলা ১৩ ম্যাচে ইউনাইটেড জিতেছে মাত্র তিনটি। লিগ টেবিলে এখন তারা সপ্তম হলেও সামনের দুই ম্যাচে সিটি ও আর্সেনালের বিপক্ষে প্রত্যাশিত ফল না এলে ফেব্রুয়ারির শুরুতেই তারা নেমে যেতে পারে টেবিলের নিচের অর্ধে। ঠিক তখনই, ১ ফেব্রুয়ারি ফুলহামের বিপক্ষে ম্যাচের দিন, ১৯৫৮ গ্রুপের সমর্থকেরা মালিকানার বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তাহলে ইউনাইটেড যাবে কোন পথে?
ইতিহাস বলছে, এমন সংকট এই ক্লাব নতুন নয়। ১৯১৪–১৫ মৌসুমে ব্র্যাডফোর্ড পার্ক অ্যাভিনিউ ও দ্য ওয়েডনেসডের মতো দলের বিপক্ষে খেলেছিল ইউনাইটেড। এরপর ১৯৪৮ সালে আবার এফএ কাপ, ১৯৫২ সালে প্রথমবার লিগ শিরোপা—স্যার ম্যাট বাসবির হাত ধরে। সেই সময় লিগ শিরোপার জন্য অপেক্ষা ছিল ৪১ বছর, যা এখনো ক্লাবের দীর্ঘতম।
চলতি মৌসুম শেষে ইউনাইটেডের লিগ শিরোপা খরা দাঁড়াবে ১৩ বছরে। সংখ্যাটা স্যার ম্যাট বাসবির শেষ লিগ জয়ের (১৯৬৭) পর স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের প্রথম শিরোপা (১৯৯৩) পর্যন্ত সময়ের প্রায় অর্ধেক। তবু আশার আলো খুঁজে পাওয়া কঠিন।
অন্তর্বর্তী কোচ ড্যারেন ফ্লেচার এফএ কাপ থেকে বিদায়ের পর বাস্তবতাই তুলে ধরেছেন। তাঁর ভাষায়, কাপের বাইরে পড়ে যাওয়াটা কঠিন সময়, কিন্তু মৌসুমটা নষ্ট করা যাবে না।
ফ্লেচারের মতে, চ্যাম্পিয়নস লিগের জায়গার জন্য এখনো লড়াই সম্ভব। যদিও তিনি স্বীকার করেছেন, এটি ইউনাইটেড সমর্থকদের প্রত্যাশার সঙ্গে যায় না। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটাই এই মৌসুমের বাস্তব লক্ষ্য।
শব্দের ভিড়ে দিশাহারা ক্লাব
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন ‘শব্দ’। ক্লাবের ভেতর-বাইরে মতামতের অভাব নেই। গ্যারি নেভিল, রিও ফার্ডিনান্ড, ওয়েন রুনি থেকে শুরু করে নিকি বাট, পল স্কোলস—সবাই নিজেদের মতো করে মত দিচ্ছেন। এমনকি স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনও গ্যালারিতে বসে এই বিশৃঙ্খলা দেখেছেন।
এই বাস্তবতা সামলানোই হবে পরবর্তী কোচের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। রুবেন আমোরিম নিজেও বলেছিলেন, মালিকপক্ষ বাইরের চাপকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিচ্ছে। আর হারতে থাকা ইউনাইটেডে সেই চাপ বাড়ছেই।
বর্তমানে সাবেক কোচ ওলে গুনার সোলশায়ার এবং তাঁর একসময়ের সহকারী মাইকেল ক্যারিক এগিয়ে আছেন সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায়। দুজনই জানেন এই দায়িত্বের ওজন কতটা ভারী।
ড্যারেন ফ্লেচার নিজেও জানেন না তাঁর ভবিষ্যৎ কী। সোমবার কারিংটনে ক্লাব কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকই তাঁর আপাতত একমাত্র নিশ্চিত সূচি। বার্নলি ও ব্রাইটনের বিপক্ষে ভালো ফল এনে নিজেকে প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরার সুযোগও কাজে লাগেনি।
এখন দেখার বিষয়, তিনি প্রথম দলের কোচিং স্টাফে থাকবেন, নাকি আবার অনূর্ধ্ব-১৮ দলের দায়িত্বে ফিরবেন।
ইউনাইটেডের খেলোয়াড়দের সামনে এখন দুটি ছুটি নির্ধারিত। বুধবার থেকে শুরু হবে ম্যানচেস্টার সিটির ম্যাচের প্রস্তুতি। তার আগেই ক্লাবের স্বল্পমেয়াদি ভবিষ্যৎ কিছুটা হলেও স্পষ্ট হওয়ার কথা।
শেষ পর্যন্ত ফ্লেচারের কথাই যেন এই মুহূর্তে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক—ক্লাবকে যেমন খেলোয়াড়দের সাহায্য করতে হবে, তেমনি খেলোয়াড়দেরও নিজেদের সাহায্য করতে হবে।

