মিরপুরের শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার যখন বিকেলের শেষ আলোটুকু ঘাসের ওপর খেলা করছিল, তখন গ্যালারিতে কান পাতলে শোনা যাচ্ছিল এক প্রলয়ংকরী গর্জনের প্রতিধ্বনি। প্রকৃতির কালবৈশাখী নয়, সেই গর্জন ছিল ২২ গজের এক দীর্ঘদেহী তরুণের— যার হাতে ধরা লাল বলটা আগুনের গোলা হয়ে ঝরেছে পাকিস্তানের দুর্গে। তিনি নাহিদ রানা।
বাংলাদেশের ফাস্ট বোলিংয়ের আকাশে তিনি এমন এক ধূমকেতু, যাঁর উদয় ক্রিকেট ইতিহাসের ধুলো জমা পুরোনো পাতাকে নতুন করে লিখিয়ে নিল।
গন্তব্য যখন গতির ওপারে
মিরপুর টেস্টের শেষ সেশন। আকাশ কিছুটা মেঘলা, সময় ফুরিয়ে আসছে। পাকিস্তানের সাত উইকেট হাতে, লক্ষ্যটাও খুব দূরের নয়। বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল একটি জাদুকরী মুহূর্তের, একটি প্রচণ্ড হুঙ্কারের। সেই মাহেন্দ্রক্ষণে বল হাতে নিলেন নাহিদ। তাঁর প্রতিটি ডেলিভারি যেন ছিল একেকটি তপ্ত তীরের ফলা। গতির যে মায়াবী অথচ বিধ্বংসী সৌন্দর্য আছে, তার ষোলোআনা আজ ফুটিয়ে তুললেন তিনি।
সাউদ শাকিল যখন তাঁর গতির কাছে বিভ্রান্ত হয়ে আলগা শটে ফিরলেন, তখনই মিরপুর বুঝে গিয়েছিল— আজ কোনো ড্র হবে না, আজ হবে জয়কাব্য। সাপের মতো ফণা তোলা বাউন্সার আর চোখের পলক পড়ার আগেই স্টাম্প তছনছ করা রিভার্স সুইংয়ে নাহিদ যেন এক রুদ্রমূর্তির আখ্যান রচনা করলেন।
আরও পড়ুন:
২৬ বছর পর বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে যে রেকর্ড গড়লেন নাহিদ রানা
শাহীনের ঔদ্ধত্য বনাম নাহিদের ‘জবাব’
ম্যাচের আগে শাহীন শাহ আফ্রিদি খানিকটা তাচ্ছিল্য ভরে বলেছিলেন, নাহিদ এবার সুবিধা করতে পারবেন না। ব্যাটিংয়ের সময় নাহিদের হেলমেটে বাউন্সার মেরে সেই ঔদ্ধত্যের স্বাক্ষরও রেখেছিলেন তিনি।
কিন্তু শাহীন জানতেন না, সেই ঋণের সুদে-আসলে ফেরত দেওয়ার এক নীলকণ্ঠী সংকল্প নিয়ে বসে আছেন নাহিদ।
শর্ট অব লেংথ থেকে ধেয়ে আসা নাহিদের সেই কামানের গোলা যখন শাহীনের গ্লাভস ছুঁয়ে মাহমুদুল জয়ের হাতে জমা পড়ল, তখন যেন স্তব্ধ হয়ে গেল গোটা ক্রিকেট বিশ্ব।
এ যেন এক অপূর্ব ‘মধুর প্রতিশোধ’!
অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর কণ্ঠেও ঝরল সেই তৃপ্তির হাসি— “রানাকে বাউন্সার মারলে আবার বাউন্সার খেতেও হবে। আমি হলে রানাকে বাউন্সার মারতাম না! কারণ আমাদের শখ নেই অত জোরে বাউন্সার খেলা।”
রেকর্ডের আয়নায় এক অনন্য নক্ষত্র
নাহিদের এই ৪০ রানে ৫ উইকেটের পরিসংখ্যানটি কেবল সংখ্যা নয়, এটি ১৬ বছরের এক দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান।
২০১০ সালে শাহাদাত হোসেন রাজীবের পর প্রথম কোনো বাংলাদেশি পেসার হিসেবে ঘরের মাঠে ৫ উইকেট নিলেন তিনি। মধ্যখানে ১৬ বছর!
কিন্তু রানার মাহাত্ম্য অন্য জায়গায়— বাংলাদেশের ২৬ বছরের টেস্ট ইতিহাসে তিনিই প্রথম পেসার, যিনি ম্যাচের চতুর্থ ইনিংসে ‘ফাইফার’ নিলেন।
৪.৫ ওভারের সেই মরণঘাতী স্পেল, যেখানে মাত্র ১০ রান দিয়ে ৪ উইকেট শিকার করে পাকিস্তানের লড়াই চিরতরে স্তব্ধ করে দিলেন তিনি। এটিই বাংলাদেশের ক্রিকেটের সেই ‘ভয়ংকর সুন্দর’ রূপ, যা দেখার জন্য এ দেশের মানুষ যুগ যুগ ধরে প্রতীক্ষা করেছে।
শান্ত ও আগামীর গান
অধিনায়ক শান্তর চোখেমুখে খেলা করছিল এক অদ্ভুত গর্ব। নিজের ১৮৮ রান ছাপিয়ে তিনি বারবার বলছিলেন তাঁর পেসারদের জয়গান।
“ওদের ড্রেসিংরুমে যে ভয়ের চোরাস্রোত বয়ে যাচ্ছিল, এটা দেখাটাও দারুণ উপভোগ্য,”— শান্তর এই একটি বাক্যই বুঝিয়ে দেয় নাহিদ রানা এখন আর কেবল একজন বোলার নন, তিনি প্রতিপক্ষের জন্য এক জীবন্ত দুঃস্বপ্ন।
বাংলাদেশের ক্রিকেট এতদিন স্পিনারদের ঘূর্ণিতেই পথ চলত। কিন্তু নাহিদ রানা প্রমাণ করলেন, এই মাটির বুক থেকেও গতির ঝড় তোলা সম্ভব।
মিরপুর আজ বিজয়ী, বাংলাদেশ আজ জয়ী— আর সেই জয়ের ললাটে তিলক হয়ে জ্বলজ্বল করছে নাহিদ রানার সেই অবিনশ্বর ‘রুদ্রমূর্তি’।

