ফুটবল মাঠে কথার লড়াই নতুন কিছু নয়। কিন্তু যখন দুই কিংবদন্তি তাঁদের সময়ের সেরা দল নিয়ে তর্কে জড়ান, তখন তা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসতে বাধ্য। সম্প্রতি অ্যামাজন প্রাইমের হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগের বিশ্লেষণে বসেছিলেন থিও ওয়ালকট ও ওয়েন রুনি। আলোচনার বিষয় ছিল—বর্তমানের অপ্রতিরোধ্য আর্সেনাল কি পারবে ২০০৮ সালের সেই ইতিহাস গড়া ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে টেক্কা দিতে?
সাবেক আর্সেনাল উইঙ্গার থিও ওয়ালকট যখন তাঁর উত্তরসূরিদের পক্ষে সওয়াল করতে যাচ্ছিলেন, তখনই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা ওয়েন রুনি তাঁকে থামিয়ে দিয়ে সটান বলে দিলেন, “আমরা ওদের স্রেফ উড়িয়ে দিতাম!”
রুনির আত্মবিশ্বাস অবাক করার মতো কিছু নয়, কারণ ২০০৮ সালের সেই দলটির অংশ ছিলেন তিনি নিজে। তবে ওয়ালকটও পিছিয়ে থাকেননি। আজকের আর্সেনালের ধারাবাহিকতা তাঁর চোখে বিশেষ কিছু।
গোলপোস্টের নিচে কে সেরা?
ইউনাইটেডের সেই দলের গোলপোস্টে ছিলেন অভিজ্ঞ এডউইন ফন ডার সার। ৩৭ বছর বয়সেও তিনি ছিলেন দুর্ভেদ্য। অন্যদিকে আর্সেনালের বর্তমানের ভরসা ৩০ বছর বয়সী ডেভিড রায়া। আধুনিক ফুটবলে রায়ার পায়ে বল নিয়ন্ত্রণ বা বিল্ড-আপ প্লে দুর্দান্ত হতে পারে, কিন্তু অর্জনের ঝুলিতে তাকালে ফন ডার সারের ধারেকাছেও কেউ নেই।
২০০৮ সাল নাগাদ ফন ডার সারের ঝুলিতে ছিল দুটি চ্যাম্পিয়নস লিগ ও অসংখ্য লিগ শিরোপা। আর রায়া এখনো ক্লাব ফুটবলে বড় কোনো সাফল্যের স্বাদ পাননি। ফলে অভিজ্ঞতায় ফন ডার সারই এগিয়ে।

রক্ষণভাগে যোজন যোজন ব্যবধান
রিও ফার্ডিনান্ড এবং নেমানজা বিদিচ—ইউনাইটেডের এই রক্ষণ জুটিকে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা হিসেবে গণ্য করা হয়। বর্তমান আর্সেনালের উইলিয়াম সালিবা এবং গ্যাব্রিয়েল যথেষ্ট শক্তিশালী হলেও ফার্ডিনান্ড-বিদিচ জুটির সাথে তাঁদের তুলনা করা সম্ভবত একটু বাড়াবাড়ি।
তবে আর্সেনালের একটি প্লাস পয়েন্ট আছে, সেটি হলো তাদের সাইড বেঞ্চের শক্তি। ইউনাইটেডের রক্ষণভাগ প্রথম পছন্দের খেলোয়াড়দের ওপর নির্ভরশীল ছিল বেশি। কিন্তু বর্তমান আর্সেনালে কালাফিওরি, টিম্বার, বেন হোয়াইট বা হিনক্যাপির মতো খেলোয়াড়রা থাকায় চোটের সমস্যা থাকলেও দলটির গভীরতা অনেক বেশি।

আক্রমণভাগের লড়াই: রোনালদো-রুনি-তেভেজ বনাম জোকেরেস-সাকা
আক্রমণভাগের বিচারে ২০০৮ সালের ইউনাইটেড অনেকটা ধরাছোঁয়ার বাইরে। একদিকে ২০০৮ সালের ব্যালন ডি’অর জয়ী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, অন্যদিকে রুনি ও কার্লোস তেভেজ। সেই মৌসুমে এই ত্রয়ী মিলে প্রতিপক্ষকে রীতিমতো শাসন করেছিলেন। তুলনায় আর্সেনালের ভিক্টর জোকেরেস ৫৫ মিলিয়ন পাউন্ডের সাইনিং হয়েও এখনো সেই উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেননি।
বুকায়ো সাকা বিশ্বমানের হলেও মার্টিনেলি বা ট্রোসার্ডরা কি রোনালদো-রুনির সমকক্ষ? পরিসংখ্যান বলছে, না। মধ্যমাঠেও ডেক্লান রাইস বা ওডেগার্ডরা দুর্দান্ত ফর্মে থাকলেও পল স্কোলস, মাইকেল ক্যারিক ও ওয়েন হারগ্রিবসদের সেই রসায়ন এখনো ফুটবল প্রেমীদের চোখে লেগে আছে।
পরিসংখ্যান ও ট্রফির বাস্তবতা
চলতি মৌসুমে আর্সেনালের পারফরম্যান্স ঈর্ষণীয়। ২৯ ম্যাচে ৬০ গোল করা গানাররা প্রিমিয়ার লিগের শীর্ষে আছে, লিগ কাপের সেমিফাইনালে উঠেছে এবং কোয়াড্রপল জেতার স্বপ্ন দেখছে। অন্যদিকে ২০০৮ সালে ইউনাইটেড ২৮ ম্যাচে করেছিল ৫৭ গোল। তবে সুযোগ তৈরির দিক থেকে ইউনাইটেড অনেক এগিয়ে ছিল (ম্যাচ প্রতি ১৮টি শট)।
সবশেষে লড়াইটা এসে থামে একটি জায়গায়—ট্রফি। ২০০৮ সালের সেই ইউনাইটেড দলটি প্রিমিয়ার লিগ ও চ্যাম্পিয়নস লিগ উভয়ই জিতেছিল। তারা ছিল বর্তমান চ্যাম্পিয়ন। অন্যদিকে বর্তমান আর্সেনাল দলটি এখনো পর্যন্ত কোনো বড় শিরোপা জেতেনি। তাদের শেষ সাফল্য সেই ২০১৯-২০ সালের এফএ কাপ।
তাহলে উপসংহার টানবেন কিভাবে?
ওয়েন রুনির সেই “উড়িয়ে দেওয়া”র দাবিকে অযৌক্তিক বলা কঠিন। মাঠের ফুটবলে আর্সেনাল যতই সুন্দর খেলুক না কেন, শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাতে হলে তাদের ট্রফি জিতেই ২০০৮ সালের ইউনাইটেডের পাশে দাঁড়াতে হবে। ট্রফি ছাড়া এই তুলনা শুধুই তাত্ত্বিক।

