ডাচ ফুটবলে রক্ষণভাগের ঐতিহ্যের তালিকাটা বেশ দীর্ঘ—রুড ক্রল, রোনাল্ড কোম্যান, রুড খুলিত কিংবা হাল আমলের ভার্জিল ফন ডাইক। এই সোনালি উত্তরাধিকারের ধারায় এবার যোগ হয়েছে নতুন এক বিস্ময় বালকের নাম; রুড নিস্টাড। এফসি টোয়েন্টের ১৮ বছর বয়সী এই দীর্ঘদেহী ডিফেন্ডার ইউরোপীয় ফুটবলের দলবদল বাজারে এখন সবচেয়ে আলোচিত নাম। বার্সেলোনা, বায়ার্ন মিউনিখ কিংবা চেলসির মতো বড় ক্লাবগুলো এই তরুণ তুর্কিকে দলে ভেড়াতে রীতিমতো যুদ্ধে নেমেছে।
ছোট শহর থেকে পাদপ্রদীপের আলোয়
২০০৮ সালের ১৭ জানুয়ারি নেদারল্যান্ডসের ছোট শহর আলমেলোতে জন্ম নিস্টাডের। ফুটবলার হওয়ার প্রথম ধাপ শুরু করেছিলেন স্থানীয় ক্লাব ডেটো’র হয়ে। ১১ বছর বয়সে টোয়েন্টে এবং হেরাক্লিসের যৌথ একাডেমিতে নাম লেখান তিনি। ১৬ বছর বয়স হওয়ার আগেই এসি মিলান ও জুভেন্টাসের নজর কেড়েছিলেন তিনি, এমনকি ইতালিতে গিয়ে ক্লাব প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকও করেছিলেন।
তবে হৃদয়ের টানে তিনি সই করেন নিজের প্রিয় ক্লাব এফসি টোয়েন্টেতে। সেখানে অনূর্ধ্ব-১৯ এবং অনূর্ধ্ব-২১ দলে তাঁর দ্রুত উত্থান সবাইকে অবাক করে দেয়। গত বছরের অক্টোবরে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আসে, যখন প্রথমবারের মতো সিনিয়র দলে ডাক পান তিনি।
স্বপ্নীল অভিষেক ও বাজিমাত
নিস্টাডের বড় সুযোগটি আসে বেশ নাটকীয়ভাবে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে হেরাক্লিসের বিপক্ষে ডার্বি ম্যাচে অধিনায়ক রবিন প্রপার ইনজুরিতে পড়লে মাত্র ৮ মিনিটের মাথায় বদলি হিসেবে মাঠে নামেন ১৭ বছর বয়সী নিস্টাড। সেই ম্যাচে ২-১ ব্যবধানে জয়ের পর সমর্থকদের ভোটে ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ নির্বাচিত হন তিনি।
অভিষেক নিয়ে নিস্টাড বলেন, “এটি সত্যিই এক অসাধারণ দিন। ৮ বছর এই একাডেমিতে খেলেছি, এখানে খেলার স্বপ্ন দেখতাম। ডার্বি ম্যাচ অন্য যেকোনো ম্যাচের চেয়ে আলাদা, কিন্তু আমি এটাকে সাধারণ ম্যাচ হিসেবেই নিয়েছিলাম।”
নিস্টাডের পারফরম্যান্স এতটাই নজরকাড়া ছিল যে, অধিনায়ক প্রপার সুস্থ হয়ে ফিরলেও নিস্টাডকে আর সাইডবেঞ্চে বসিয়ে রাখার সাহস পাননি কোচ জন ভ্যান ডেন ব্রম।
চলতি মৌসুমে আয়াক্সের বিপক্ষে ১টি অ্যাসিস্ট এবং ভলেনডামের বিপক্ষে পেশাদার ক্যারিয়ারের প্রথম গোলও করেছেন তিনি। মার্চ মাসে ডাচ অনূর্ধ্ব-১৯ জাতীয় দলেও জায়গা করে নিয়েছেন এই ডিফেন্ডার।
আরও পড়ুন: বায়ার্নেই থাকছেন হ্যারি কেইন? চুক্তি নবায়নের আলোচনা শুরু
খেলার ধরন ও শক্তি: নতুন ফ্রাঙ্ক ডি বোর?
নিস্টাড মূলত ‘মডার্ন ডিফেন্ডার’-এর এক আদর্শ উদাহরণ। ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি উচ্চতার এই লেফট-ফুটেড সেন্টার ব্যাক বল পায়ে দারুণ আত্মবিশ্বাসী। লং পাসে তাঁর নিখুঁত লক্ষ্য এবং প্রয়োজনে ইনভার্টেড লেফট-ব্যাক বা মিডফিল্ডে উঠে এসে আক্রমণকে সহায়তা করার ক্ষমতা তাঁকে অনন্য করেছে।
অনেকেই তাঁকে কিংবদন্তি ফ্রাঙ্ক ডি বোর-এর সঙ্গে তুলনা করছেন। দুজনই বাঁ-পায়ে পারদর্শী এবং ১৮ বছর বয়সে ডাচ লিগে অভিষেক ঘটিয়েছেন। আবার ম্যানচেস্টার সিটির নাথান আকের খেলার ধরনের সঙ্গেও তাঁর মিল পাওয়া যায়।
দুর্বলতা ও উন্নতির জায়গা
নিস্টাড নিজেও স্বীকার করেন, পেনাল্টি এরিয়ার ভেতরে রক্ষণাত্মক দক্ষতায় এবং ডান পায়ের কাজে তাঁর আরও উন্নতির সুযোগ রয়েছে। আয়াক্সের বিপক্ষে ম্যাচে ভাউট ওয়েঘর্স্টের বিপক্ষে এরিয়াল ডুয়েলে কিছুটা ভুগতে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। যা প্রমাণ করে, ইউরোপের শীর্ষ পর্যায়ে যেতে হলে তাঁকে বাতাসে বল দখলের লড়াইয়ে আরও পটু হতে হবে।
আরও পড়ুন: বার্সেলোনায় লেভানডোভস্কির বিদায়ের সুর!
দলবদল জল্পনা: পরবর্তী গন্তব্য কোথায়?
টোয়েন্টের সঙ্গে ২০২৭ সাল পর্যন্ত চুক্তি থাকলেও নিস্টাডকে এ মৌসুমেই ছাড়তে হতে পারে ক্লাবটিকে। বার্সেলোনা, বায়ার্ন ও চেলসি এরই মধ্যে তাঁর বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। মাত্র ৮ মিলিয়ন ইউরো খরচ করলেই এই প্রতিভাকে দলে পাওয়া সম্ভব—যা বর্তমান বাজারের তুলনায় নামমাত্র মূল্য।
সম্প্রতি ইএসপিএন-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিস্টাড তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে বলেন, “হয় আমাকে চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে হবে, না হয় ক্লাব ছাড়তে হবে। আমি জানি কী করতে হবে, তবে আপাতত আমি টোয়েন্টের খেলোয়াড়। আমি শুধু ফুটবলে মনোযোগ দিতে চাই।”
কোচ জন ভ্যান ডেন ব্রমের মতে, নিস্টাড তাঁর কোচিং ক্যারিয়ারের দেখা সেরা পাঁচ প্রতিভার একজন। এখন দেখার বিষয়, আগামী মৌসুমে ক্যাম্প ন্যু, আলিয়াঞ্জ অ্যারেনা না কি স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে দেখা যায় এই ডাচ বিস্ময়কে।

