ঢাকার উপকণ্ঠে পূর্বাচলের সেই ধূলো ধূসরিত প্রান্তরটি যেন বাংলাদেশের ক্রীড়া রাজনীতির এক জীবন্ত দলিল। যে প্রান্তর জুড়ে এক সময় এশিয়ার অন্যতম সেরা ‘নৌকা’ আকৃতির স্টেডিয়াম গড়ার স্বপ্ন বোনা হয়েছিল, ৭ বছর পেরিয়ে আজ সেখানে কেবলই শূন্যতা আর নকশা বদলের দীর্ঘশ্বাস। দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ক্রীড়া স্থাপনাটি এখন দাঁড়িয়ে আছে এক বড়সড় পরিবর্তনের মুখে—যেখানে এককালের ‘শেখ হাসিনা ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়াম’ নাম বদলে হয়েছে ‘ন্যাশনাল ক্রিকেট গ্রাউন্ড (এনসিজি)’, আর নৌকার গলুইয়ের বদলে উঁকি দিচ্ছে বহুমুখী ‘স্পোর্টস হাব’-এর পরিকল্পনা।
পট পরিবর্তন ও নকশা বদলের আবর্তন
২০১৯ সালে যখন বিসিবির তৎকালীন সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন ঘোষণা দিয়েছিলেন, নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ১৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে পূর্বাচলের ৩৭.৪৯ একর জমিতে হবে আইকনিক স্টেডিয়াম। তখন লক্ষ্য ছিল ২০২৪ সালে নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনাল সেখানে আয়োজন করা।
কিন্তু দৃশ্যপট বদলে দেয় ২০২৪-এর আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর বিসিবিতে শুরু হয় পালাবদলের হিড়িক। ফারুক আহমেদ থেকে শুরু করে আমিনুল ইসলাম বুলবুল, এরপর তামিম ইকবাল—গত দেড় বছরে বিসিবির চারজন সভাপতি সেই মাটি স্পর্শ করেছেন, কিন্তু মূল কাঠামোর একটি ইটও গাঁথা হয়নি।
গেল বছরের ৩ মার্চ তৎকালীন সভাপতি ফারুক আহমেদের নেতৃত্বাধীন বিসিবি ‘শেখ হাসিনা ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়াম’ এর নামে বদল আনে। এটির নতুন নাম দেওয়া হয় ‘ন্যাশনাল ক্রিকেট গ্রাউন্ড (এনসিজি)’
বর্তমানে বিসিবির অ্যাড-হক কমিটির সভাপতির দায়িত্বে আছেন দেশের অন্যতম ক্রিকেট আইকন তামিম ইকবাল। দায়িত্ব গ্রহণের ১১ দিনের মাথায় আজ শনিবার তিনি সশরীরে হাজির হলেন পূর্বাচলে। সঙ্গে ছিলেন নবনিযুক্ত যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক।
আরও পড়ুন: নির্বাচনের ঘোষণা দিলেন তামিম ইকবাল!
তামিমের নতুন দর্শন ‘স্পোর্টস হাব’
পূর্বাচল পরিদর্শনের পর তামিম ইকবাল তাঁর পরিকল্পনার যে রূপরেখা দিয়েছেন, তা পূর্বসূরিদের চেয়ে কিছুটা আলাদা। তামিমের মতে, নকশায় কিছু পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি।
তিনি বলেন, “মাননীয় প্রতিমন্ত্রীকে আমরা পুরো নকশাটি দেখিয়েছি। এখানে কিছু পরিবর্তন খুব জরুরি—শুধু পরিবর্তনের খাতিরে নয়, বরং প্রয়োজনে। এটি দেশের অনেক বড় সম্পদ। শুধু ক্রিকেট নয়, আমাদের সামগ্রিক ক্রীড়াঙ্গনের কথা মাথায় রেখে এখানে অন্য কিছু স্পোর্টসের ব্যবস্থা করে দেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে আমরা বিশেষজ্ঞ ও এনএসসির সঙ্গে আলোচনা করব।”
তামিমের এই বক্তব্যের পেছনে স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে যে, বিশাল অর্থ ব্যয়ে কেবল একটি ক্রিকেট মাঠ নয়, বরং এটিকে একটি আধুনিক বহুমুখী ক্রীড়া কমপ্লেক্সে রূপ দিতে চায় নতুন বোর্ড।
তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞে সরকারের বড় বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথা মনে করিয়ে দিয়ে তামিম যোগ করেন, “এতদিন শুধু আলোচনা হয়েছে, কাজ শুরু হয়নি। এবার আমাদের প্রধান লক্ষ্য কাজ শুরু করা।”
আরও পড়ুন: তামিমের অঙ্গীকার, তামিমের প্রতিশ্রুতি
নজরে ২০২৭ এশিয়া কাপ ও ২০৩১ বিশ্বকাপ
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক অবশ্য এই প্রজেক্ট নিয়ে শোনালেন বড় আশার বাণী। ২০২৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় ওয়ানডে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে বাংলাদেশে বসবে ওয়ানডে ফরম্যাটের এশিয়া কাপ। এর চার বছর পর ২০৩১ সালে ভারত ও বাংলাদেশ যৌথভাবে আয়োজন করবে ওয়ানডে বিশ্বকাপ।
আমিনুল হক বলেন, “২০২৭ এশিয়া কাপ এবং ২০৩১ বিশ্বকাপের কো-হোস্ট হওয়ার সুযোগ মাথায় রেখে আমরা এগোচ্ছি। প্রথম ধাপে বিসিবি নিজেই কার্যক্রম শুরু করবে, পরে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আমরা চাই এখানে একটি ‘স্পোর্টস হাব’ গড়ে তুলতে, যাতে ক্রিকেট ছাড়াও অন্য খেলার মানোন্নয়ন ঘটে।”
ব্যয় ও অনিশ্চয়তার দোলাচল
২০১৯ সালে ৯০০ কোটি টাকা দিয়ে শুরু হওয়া প্রজেক্টের সম্ভাব্য ব্যয় ২০২৪ সালে এসে দাঁড়িয়েছিল ১৫০০ কোটিতে। বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতি এবং নকশা পরিবর্তনের পর এই ব্যয় কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তার সঠিক ধারণা এখনও দিতে পারেনি বিসিবি।
এদিকে, অস্ট্রেলিয়ান পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘পপুলাস’-এর করা নৌকার আদলের নকশাটি এখন আক্ষরিক অর্থেই হিমঘরে। তামিমের বোর্ড এখন নতুন করে অগ্রাধিকার ঠিক করছে।
আরও পড়ুন: জাতীয় স্টেডিয়ামে ১০ লাখের ঘাস লাগিয়ে ‘ভুলের মাশুল’ ৬২ লাখ!
স্বপ্ন কি আলোর মুখ দেখবে?
পূর্বাচল স্টেডিয়াম প্রকল্পটি এখন যেন বাংলাদেশের ক্রীড়া প্রশাসনের এক বড় অগ্নিপরীক্ষা। পাপন আমলের আড়ম্বরপূর্ণ ‘নৌকা’ নকশা থেকে ফারুক আহমেদের ‘এনসিজি’ হয়ে তামিম ইকবালের ‘স্পোর্টস হাব’—পরিকল্পনার এই ঘনঘন রূপান্তর সাধারণ ভক্তদের মনে বড় প্রশ্ন হয়ে বিঁধছে। ৩ মে পাকিস্তান টেস্ট দল বাংলাদেশে পৌঁছানোর আগে নতুন বোর্ড পূর্বাচল নিয়ে কতটা শক্তিশালী বার্তা দিতে পারে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
আলোচনা আর পরিদর্শনের বৃত্ত ভেঙে পূর্বাচলের মাটির বুক চিরে কি সত্যিই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের অবকাঠামো দাঁড়িয়ে যাবে? না কি ২০২৭ এশিয়া কাপের স্বপ্নও এক সময় স্রেফ এক গুচ্ছ ফাইলের নিচে চাপা পড়বে—উত্তর মিলবে কেবল কাজ শুরু হলে।
টাইম লইন: পূর্বাচল স্টেডিয়াম প্রজেক্ট
ফেব্রুয়ারি ২০১৯: শেখ হাসিনা ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামের ঘোষণা।
জুলাই ২০১৯: নৌকার আদলে নকশা ও ৩৭.৪৯ একর জমি বুঝে পাওয়া।
অক্টোবর ২০২২: পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার ‘পপুলাস’-কে চূড়ান্ত করা।
আগস্ট ২০২৪: গণ-অভ্যুত্থানের পর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ন্যাশনাল ক্রিকেট গ্রাউন্ড’। নির্মাণকাজের দরপত্র বাতিল।
এপ্রিল ২০২৬: তামিম ইকবালের নেতৃত্বে নকশা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত ও ‘স্পোর্টস হাব’ গঠনের পরিকল্পনা।

