Taposh Baishya Cricfoot24

“যদি স্বপ্ন আর পরিশ্রম থাকে, তাহলে সব সম্ভব”

বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথম টেস্ট জয় কেবল একটি ম্যাচ জয়ের গল্প নয়। এটি ছিল সীমিত সামর্থ্য, কঠিন বাস্তবতা আর অদম্য স্বপ্ন নিয়ে লড়ে যাওয়া একটি প্রজন্মের সম্মিলিত সাফল্য। সেই ঐতিহাসিক দলেরই একজন সদস্য তাপস বৈশ্য, যাঁর নাম অনেক সময় আলোচনার বাইরে থাকলেও অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

গেল ১০ জানুয়ারি, বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়ের স্মরণীয় দিনে ফেসবুকে নিজের ক্রিকেট জীবনের শুরুর গল্প শেয়ার করেন তাপস বৈশ্য। তাঁর লেখায় ফিরে আসে শেকড়ের টান, সংগ্রামের স্মৃতি আর মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা।

“যাত্রা শুরু—জয়নগর, এইডেড স্কুল কুমারপাড়া টু গোলাপগঞ্জ, কুচাই, লালাবাজার, বিয়ানীবাজার, তাজপুর, মৌলভীবাজার, কুলাউড়া, সিলেটের অলিগলি, রিকাবিবাজার টু ঢাকা।”

এই একটি লাইনের মধ্যেই ধরা পড়ে তাপস বৈশ্যের পুরো পথচলার মানচিত্র। সিলেটে জন্ম ও বেড়ে ওঠা, সেখানেই ক্রিকেটের হাতেখড়ি। স্কুল ক্রিকেট থেকে জেলা–উপজেলার মাঠ পেরিয়ে জাতীয় দলের দরজায় পৌঁছানো, এই যাত্রা কখনোই সহজ ছিল না।

তাপসের লেখার এক জায়গায় উঠে আসে সেই সময়ের কঠিন বাস্তবতা, “দাদা সুজন বৈশ্য (বড় ভাই) কাছ থেকে প্রথম ২০০ টাকার খেলার জুতা, সাথে ১৯০ টাকার সাদা টি-শার্ট আর ট্রাউজার, আর দাদার দেওয়া ৭ হাজার টাকা (১৯৯৭ ইং), যা এখনও দেওয়া হয়নি।”

এই স্মৃতিগুলো শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং নব্বইয়ের দশকের বাংলাদেশের ক্রিকেট বাস্তবতার এক জীবন্ত দলিল। আরেক জায়গায় তিনি লিখেন, “ফরহাদ ভাই থেকে এক সাইজ বড় বোলিং শু।”

এক সাইজ বড় সেই জুতাটাই যেন হয়ে ওঠে প্রতীক, তাঁর স্বপ্ন তখনও বর্তমানের চেয়ে বড় ছিল।

বাংলাদেশের হয়ে তাপস বৈশ্য খেলেছেন ২১টি টেস্ট ও ৫৬টি ওয়ানডে ম্যাচ। ছিলেন দেশের প্রথম টেস্ট জয়ের একাদশে। দুই ইনিংসে তাপসের তিন উইকেট জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সেই জয়ে কোনো অংশ কম ছিল না।

Bangladesh first test win in 2005

তবে ক্রিকেট জীবন সব সময় পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে না। ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে ইনজুরিতে পড়ে হঠাৎ করেই থেমে যায় তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। দীর্ঘ পুনর্বাসনের পর ঘরোয়া ক্রিকেটে ফিরলেও জাতীয় দলে আর ফেরা হয়নি।

তবু তাঁর লেখায় নেই কোনো ক্ষোভ বা আক্ষেপ। বরং আছে আত্মস্বীকৃতি ও বিস্ময়ের অনুভব, “ছবির সামনে হাতের ডানে সেই আমি, যা আমারই বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে, বা আমি রোমাঞ্চিত।”

কিছুদিন ঘরোয়া ক্রিকেট খেলার পর বাস্তবতার টানে তিনি পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। মাঠ বদলালেও ক্রিকেট আর বাংলাদেশের প্রতি আবেগ থেকে যায় অটুট।

তাপস বৈশ্যের লেখার সবচেয়ে শক্তিশালী অংশটি আসে একেবারে শেষদিকে, “যদি স্বপ্ন আর পরিশ্রম থাকে তাহলে সব সম্ভব। আমার কোনো অভিযোগ ছিল না, তাহলে তোমার কেন থাকবে! পারফরম্যান্স করতে থাকো, ডাক আসবেই।”

এই কথাগুলো কেবল একজন সাবেক ক্রিকেটারের স্মৃতিচারণ নয়; এটি নতুন প্রজন্মের জন্য এক নীরব কিন্তু গভীর বার্তা। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে অনেক নাম সময়ের আড়ালে হারিয়ে যায়, কিন্তু কিছু গল্প থেকে যায়, অনুপ্রেরণা হয়ে।

তাপস বৈশ্যের গল্প ঠিক তেমনই একটি গল্প।