উত্তর আমেরিকায় ফুটবল ম্যাচ চলাকালে আবহাওয়ার বৈরী আচরণ নতুন কিছু নয়। তবে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ টুর্নামেন্ট এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা বেশ কয়েকটি আয়োজক শহরে বজ্রঝড়ের প্রধান সময়। ফলে ফুটবলার ও দর্শকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবার বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রাকৃতিক এই দুর্যোগের কারণে আগামী বিশ্বকাপে একাধিক ম্যাচ বন্ধ হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
গত গ্রীষ্মে ক্লাব ওয়ার্ল্ড কাপে চেলসি বনাম বেনফিকার ম্যাচটি চরম আবহাওয়ার কারণে প্রায় পৌনে পাঁচ ঘণ্টা দীর্ঘ হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের মাত্র ৪ মিনিট আগে বজ্রপাতের কারণে খেলা স্থগিত হয়। প্রায় দুই ঘণ্টা ড্রেসিংরুমে বন্দি থাকার পর খেলা পুনরায় শুরু হয়। চেলসি কোচ এনজো মারেস্কা ক্ষোভ প্রকাশ করে এটিকে ‘কৌতুক’ বললেও বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা স্পষ্ট জানিয়েছে, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের আবহাওয়া নির্দেশিকাই এখানে শেষ কথা।
আট মাইলের নিয়ম ও ৩০ মিনিটের কাউন্টডাউন
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (NOAA) নিয়ম অনুযায়ী, স্টেডিয়ামের আট মাইলের মধ্যে কোনো বজ্রপাত শনাক্ত হলেই খেলা সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করতে হবে। ইউরোপের ফুটবলে এমন নিয়ম সচরাচর দেখা যায় না।
তবে উত্তর আমেরিকায় বজ্রপাত ইউরোপের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি সাধারণ বিষয় হওয়ায় সেখানে এই নিয়ম কঠোরভাবে মানা হয়।
খেলা বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে খেলোয়াড়দের দ্রুত মাঠ ছাড়তে হয় এবং দর্শকদের গ্যালারির আসন ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়।
এরপর শুরু হয় একটি বাধ্যতামূলক ৩০ মিনিটের কাউন্টডাউন। এই ৩০ মিনিটের মধ্যে যদি স্টেডিয়ামের নির্দিষ্ট দূরত্বের ভেতর আবারও কোনো বজ্রপাত রেকর্ড করা হয়, তবে ঘড়ির কাঁটা রিসেট হয়ে পুনরায় নতুন করে ৩০ মিনিটে ফিরে যায়। আবহাওয়া সম্পূর্ণ পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকে।
আরও পড়ুন:
বিশ্বকাপের বিস্ময়-৪: মেক্সিকোর বাজি ১৭ বছরের গিলবার্তো মোরা
ম্যাচ বাতিল বা স্থগিত হলে ফিফার নিয়ম
যদি আবহাওয়া পরিস্থিতির কোনো উন্নতি না হয় এবং শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি পরিত্যক্ত করতে হয়, তবে ফিফার নিয়ম অনুযায়ী খেলাটি পরবর্তী কোনো তারিখে পুনরায় মাঠে গড়াবে। তবে ফুটবল ভক্তদের জন্য আশার কথা হলো, ম্যাচটি একেবারে প্রথম থেকে শুরু হবে না। ঠিক যে মিনিটে খেলাটি বন্ধ হয়েছিল, সেখান থেকেই বাকি সময়ের খেলা অনুষ্ঠিত হবে।
টুর্নামেন্টের ঠাসা সূচির কারণে সাধারণত পরদিনই এই ম্যাচ আয়োজন করার বাধ্যবাধকতা থাকবে।
যেমন কোনো ম্যাচ যদি খেলার ৭৬তম মিনিটে বন্ধ হয়ে যায়, তবে পরের দিন ফুটবলাররা মাঠে নেমে শুধু বাকি ১৪ মিনিটের খেলা শেষ করবেন। তবে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচগুলোর ক্ষেত্রে এই নিয়ম জটিলতা তৈরি করতে পারে। কারণ নকআউট পর্বের ভাগ্য নির্ধারণী গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচগুলো একই সময়ে আয়োজন করার নিয়ম রয়েছে।
সে ক্ষেত্রে একটি ম্যাচ বন্ধ হলে অন্য ম্যাচটিও স্থগিত করা হবে কি না, তা নিয়ে বড় ভাবনায় রয়েছে ফিফা।
জলবায়ু পরিবর্তন ও ঝুঁকিতে থাকা ভেন্যুগুলো
১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে প্রচণ্ড গরম থাকলেও কোনো ম্যাচ বন্ধ হয়নি। তবে গত ৩০ বছরে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি এমন চরম আবহাওয়ার ঘটনা ইদানীং অনেক বেড়ে গেছে। উষ্ণ বাতাস এবং বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী বজ্রঝড় সৃষ্টি হচ্ছে।
আধুনিক প্রযুক্তির কারণে এখন সশরীরে বজ্রপাত দেখার আগেই নিখুঁতভাবে তা শনাক্ত করা যায়।
আসন্ন ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টে আটলান্টা, ডালাস, হিউস্টন, মায়ামি এবং নিউ জার্সির মতো ভেন্যুগুলো বজ্রঝড়ের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে এর মধ্যে ডালাস ও হিউস্টনের মতো কিছু স্টেডিয়ামে ছাদ বন্ধ করার সুবিধা থাকায় বজ্রপাতের সরাসরি প্রভাব কিছুটা এড়ানো সম্ভব হবে।
ইউরো ২০২৪-এ জার্মানি বনাম ডেনমার্ক ম্যাচটি বজ্রপাতের কারণে ২৫ মিনিট বন্ধ ছিল।
তবে উত্তর আমেরিকার আকাশ এবার ফুটবলার ও ফুটবলপ্রেমীদের জন্য আরও বড় পরীক্ষা নিতে যাচ্ছে।

