ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও লুকা মদ্রিচ একসময় রিয়াল মাদ্রিদে খেলতেনযখন একইসঙ্গে রিয়াল মাদ্রিদে ছিলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও লুকা মদ্রিচ। ছবি: গেটি ইমেজেস

ফুটবল বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। মাঠের পারফরম্যান্স হোক কিংবা ব্যক্তিগত শৃঙ্খলা—রোনালদো সবসময়ই এক অদম্য মানসিকতার পরিচয় দিয়ে আসছেন। এমনকি ২০১৬ সালের ইউরো ফাইনালে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়ার পর সাইডলাইন থেকে যেভাবে দলকে নির্দেশনা দিয়েছিলেন, তা দেখে অনেকেই তাঁকে ভবিষ্যৎ কোচ হিসেবেও গণ্য করেন। কিন্তু সেই পাহাড়সম ব্যক্তিত্বকেও একবার ড্রেসিংরুমে কাঁদতে হয়েছিল!

সম্প্রতি রিয়াল মাদ্রিদের কিংবদন্তি মিডফিল্ডার লুকা মদ্রিচ সেই রোমহর্ষক ঘটনার স্মৃতিচারণ করেছেন। ইতালীয় সংবাদপত্র কুরিয়ারে ডেলা সেরা-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে মদ্রিচ জানান, তাঁর দেখা ক্যারিয়ারের ‘সবচেয়ে কঠিন’ কোচ হলেন জোসে মরিনহো। আর এই মরিনহোর কঠোর শাসনের মুখেই একসময় ভেঙে পড়েছিলেন রোনালদো।

হাফ-টাইমে সেই নাটকীয় মুহূর্ত

মদ্রিচ ও রোনালদো রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে দীর্ঘদিন একসাথে খেলেছেন। জিতেছেন চারটি চ্যাম্পিয়নস লিগসহ অসংখ্য ট্রফি। তবে সাফল্যের সেই পথের আড়ালে ড্রেসিংরুমের পরিবেশ সবসময় শান্ত ছিল না।

মদ্রিচ সেই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, “আমি দেখেছিলাম মরিনহো ড্রেসিংরুমে রোনালদোকে কাঁদিয়ে ছেড়েছেন। রোনালদো এমন একজন খেলোয়াড় যে মাঠে নিজের সবটুকু উজাড় করে দেয়। কিন্তু সেদিন স্রেফ একবার প্রতিপক্ষের ফুল-ব্যাককে ধাওয়া না করায় মরিনহো তাঁর ওপর প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন।”

মদ্রিচের মতে, মরিনহো ছিলেন অত্যন্ত সরাসরি এবং সোজাসাপ্টা। তিনি বলেন, “মরিনহো কোনো রাখঢাক করতেন না। তিনি সার্জিও রামোস বা অন্য যেকোনো মহাতারকার ভুল ধরিয়ে দিতে দ্বিধা করতেন না। তাঁর সেই কঠোরতা রোনালদোর মতো আবেগী এবং পরিশ্রমী খেলোয়াড়কেও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল।”

সাফল্য ও সংঘাতের দ্বৈরথ

২০১০ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত রিয়াল মাদ্রিদে মরিনহো ও রোনালদো একসাথে কাজ করেছেন। সেই সময়টি ছিল রিয়ালের পুনরুত্থানের কাল। মরিনহোর অধীনেই রোনালদো ২০১১-১২ মৌসুমে রেকর্ড ৬০ গোল করেছিলেন এবং রিয়াল মাদ্রিদ বার্সেলোনার আধিপত্য ভেঙে লা লিগা জিতেছিল। তবে মাঠের সেই গোলবন্যার পেছনে ছিল মরিনহোর নির্মম পরিশ্রম আর শাসনের গল্প।

মরিনহোর সেই চূড়ান্ত দাবি এবং প্রকাশ্যে সমালোচনা করার প্রবণতা ড্রেসিংরুমে অস্থিরতা তৈরি করেছিল। বিশেষ করে ২০১২-১৩ মৌসুমে রোনালদোর সাথে মরিনহোর সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। মরিনহো একবার বলেছিলেন, “রোনালদো মনে করে সে সবকিছু জানে।”

রক্ষণে সাহায্য না করার সেই ছোট ভুলটিই শেষ পর্যন্ত দুই পর্তুগিজ আইকনের মধ্যে বিশাল ফাটল তৈরি করেছিল।

জোসে মরিনহোর কোচিংয়ে রিয়াল মাদ্রিদে খেলেছিলেন রোনালদো
রিয়াল মাদ্রিদে মরিনহোর কোচিংয়ে খেলেছিলেন রোনালদো। ছবি: রয়টার্স

আনচেলত্তি বনাম মরিনহো: মদ্রিচের দৃষ্টিভঙ্গি

মদ্রিচের ক্যারিয়ারে মরিনহো যদি হন ‘কঠিনতম’, তবে কার্লো আনচেলত্তি হলেন ‘প্রিয়তম’। বর্তমানে ৪০ বছর বয়সেও এসি মিলানের হয়ে মাঠ কাঁপানো এই ক্রোয়াট তারকা জানান, আনচেলত্তি কোচ হিসেবে নন, বরং একজন অভিভাবক হিসেবে তাঁর হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন।

মদ্রিচ বলেন, “কার্লোর কথা বলতে গেলে আমার কাছে শব্দ কম পড়ে যায়। তিনি শুধু একজন সেরা কোচই নন, তাঁর ব্যক্তিত্ব অসাধারণ। রিয়ালে থাকাকালীন আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফুটবল, পরিবার এবং জীবন নিয়ে কথা বলতাম। আনচেলত্তি তাঁর খেলোয়াড়দের ওপর যে অগাধ বিশ্বাস রাখেন, তা অন্য কোনো কোচের মধ্যে দেখা যায় না।”

লুকা মদ্রিচের এই সাক্ষাৎকার ফুটবল বিশ্বের এক ভিন্ন দিক উন্মোচন করেছে। মরিনহোর সেই কঠোরতা এবং রোনালদোর চোখের জলই হয়তো রিয়াল মাদ্রিদকে সেই সময়ে অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছিল। ফুটবল ইতিহাসে মরিনহো আজও একজন সফল এবং বিতর্কিত কোচ হিসেবে অম্লান, যিনি মহাতারকাদেরও নিজের কঠোর শাসনের শেকলে বাঁধতে জানতেন।