ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা সবশেষ যখন আর্সেনালের ঘরে উঠেছিল, তখন বর্তমান প্রজন্মের অনেক ফুটবলারের জন্মই হয়নি। দীর্ঘ ২২ বছরের সেই আক্ষেপ ঘোচানোর স্বপ্ন এবার উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল গানার সমর্থকদের চোখে। তবে এমিরেটস স্টেডিয়ামে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কাছে ৩-২ গোলে হার যেন এক বড় ধাক্কা হয়ে এলো। এই হারের ফলে শীর্ষে থাকা আর্সেনালের লিড ৭ পয়েন্ট থেকে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ পয়েন্টে।
টানা তিন ম্যাচ জয়হীন থাকার এই সময়টা কি কেবলই একটি খারাপ সময়, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো গভীর সংকট? বিশ্লেষণ কী বলে?
চাপের মুখে কি নুয়ে পড়ছে গানাররা?
শিরোপা জয়ের সুবাস যখন নাকে লাগে, তখন স্নায়ুর ওপর চাপ বেড়ে যাওয়াটা স্বাভাবিক। সাবেক আর্সেনাল তারকা প্যাট্রিক ভিয়েরা এবং ফুটবল বিশ্লেষক রয় কিন—দুজনের মতেই, মাঠের লড়াইয়ে আর্সেনালের ফুটবলারদের মধ্যে এক ধরনের মানসিক জড়তা ও ভীতি কাজ করছে। বিশেষ করে ঘরের মাঠে ইউনাইটেডের বিপক্ষে ম্যাচে এই অস্থিরতা ছিল স্পষ্ট।
গত তিন মৌসুমের মধ্যে দুইবারই লিগ টেবিলের শীর্ষে থেকেও শেষ মুহূর্তে শিরোপা হারিয়েছে আর্সেনাল। সেই পুরনো ক্ষতের কারণেই কি তবে ফুটবলাররা স্নায়ুচাপে ভুগছেন? নটিংহ্যাম ফরেস্ট বা লিভারপুলের বিপক্ষে ম্যাচেও এই উত্তেজনার ছাপ দেখা গিয়েছিল। শিরোপার লড়াইয়ে টিকে থাকতে হলে এই মানসিক বাধা অতিক্রম করা আর্তেতার দলের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আক্রমণভাগের নজিরবিহীন গোলখরা
আর্সেনালের রক্ষণভাগ যতোই শক্তিশালী হোক না কেন, তাদের আক্রমণভাগ বর্তমানে এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে যে কোনো গানার ভক্তের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়বে:
বুকায়ো সাকা: সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে গত ১৩ ম্যাচে কোনো গোল পাননি।
ভিক্টর গিওকেরেস: প্রিমিয়ার লিগে শেষ ১১ ম্যাচে পেনাল্টি ছাড়া কোনো গোল করতে পারেননি।
গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেলি: লিগে টানা ১৩ ম্যাচ ধরে গোলহীন।
ননি মাদুয়েকে: প্রিমিয়ার লিগে গোল পাননি টানা ২৫ ম্যাচে।
লিয়েন্দ্রো ট্রোসার্ড: সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে গত ১১ ম্যাচে গোল করেছেন মাত্র একটি।লিগের শীর্ষ ২০ গোলদাতার তালিকায় আর্সেনালের একজন ফুটবলারও নেই। দলের অধিকাংশ গোল আসছে সেট-পিস থেকে। চ্যাম্পিয়নস লিগে বায়ার্ন মিউনিখ বা ইন্টার মিলানের জালে গোল উৎসব করলেও, প্রিমিয়ার লিগে দলটির আক্রমণভাগ যেন খেই হারিয়ে ফেলছে। দলগুলো যখন আর্সেনালের বিপক্ষে রক্ষণাত্মক কৌশলে খেলে, তখন সাকা বা ওডেগার্ডদের জন্য স্পেস তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ওডেগার্ড বনাম এজে: মিডফিল্ডের নতুন সমীকরণ
অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড সাধারণত আর্সেনালের মাঝমাঠের প্রাণভোমরা। তবে ইউনাইটেডের বিপক্ষে তিনি ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে। মাত্র ৬২ মিনিটের মাথায় আর্তেতা যখন তাকে মাঠ থেকে তুলে নেন, তখন বোঝা যাচ্ছিল কোচ তার ওপর থেকে আস্থা হারাচ্ছেন। প্যাট্রিক ভিয়েরার মতে, ওডেগার্ড বড্ড ‘নিরাপদ ফুটবল’ খেলছেন। তাকে আরও ওপরের দিকে উঠে খেলা দরকার।
অন্যদিকে, এবার দলে আসা এবারিচি এজে যখনই সুযোগ পেয়েছেন, আর্সেনালের আক্রমণে গতি ফিরেছে। টটেনহ্যামকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দেওয়া কিংবা চ্যাম্পিয়নস লিগের বড় জয়গুলোতে এজের ভূমিকা ছিল উজ্জ্বল। ওডেগার্ডের নিয়ন্ত্রিত ফুটবলের বদলে এজের সৃজনশীলতা ও আক্রমণাত্মক মেজাজ আর্তেতাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
আর্তেতার কৌশল ও ক্লান্তির ছাপ
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে ম্যাচে আর্সেনালকে বেশ ক্লান্ত মনে হয়েছে। এর বড় কারণ হতে পারে মিলানে ইন্টারের বিপক্ষে সেই অপ্রয়োজনীয় ম্যাচ। চ্যাম্পিয়নস লিগের নকআউট পর্ব নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার পরও আর্তেতা তার মূল একাদশের ৫-৬ জন নিয়মিত খেলোয়াড়কে খেলিয়েছেন। সাকা, সালিবা বা জুবিনেন্দির মতো ফুটবলাররা পর্যাপ্ত বিশ্রাম না পাওয়ায় ইউনাইটেডের ফ্রেশ ফুটবলারদের সাথে গতির লড়াইয়ে হেরে গেছেন। স্কোয়াডে যথেষ্ট গভীরতা থাকা সত্ত্বেও খেলোয়াড়দের সঠিক রোটেশন করতে না পারা আর্তেতার জন্য এক বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
এখনো কি আশা আছে?
সব নেতিবাচকতার মাঝেও আশার আলো হলো, আর্সেনাল এখনো টেবিলের শীর্ষে। চ্যাম্পিয়নস লিগে তাদের পারফরম্যান্স দুর্দান্ত এবং কারাবাও কাপের সেমিফাইনালেও তারা এক পা দিয়ে রেখেছে। অপটা সুপারকম্পিউটারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আর্সেনালের শিরোপা জয়ের সম্ভাবনা এখনো ৮১.৭ শতাংশ। ম্যানচেস্টার সিটির সম্ভাবনা যেখানে মাত্র ৮.৭ শতাংশ, সেখানে আর্সেনাল এখনো পরিষ্কার ফেবারিট।
তবে ইতিহাস বলে, শিরোপা জেতার শেষ ধাপটিই হয় সবচেয়ে কঠিন। লিডস, সান্ডারল্যান্ড বা ব্রেন্টফোর্ডের বিপক্ষে আসন্ন ম্যাচগুলোতে ঘুরে দাঁড়াতে না পারলে আর্তেতার দলের ওপর চাপ কেবল বাড়তেই থাকবে। আর্সেনাল কি পারবে তাদের দীর্ঘ ২২ বছরের আক্ষেপ মিটিয়ে রাজত্ব ফিরে পেতে?

