২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে ঘিরে গত কয়েকদিনে ক্রিকেট বিশ্বে যে নজিরবিহীন অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল, তার নাটকীয় অবসান ঘটেছে লাহোরের ঐতিহাসিক গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল এই সফল মিশনকে ১৯৭১ সালে চীন-আমেরিকার মধ্যকার ‘পিং-পং ডিপ্লোমেসি’র সঙ্গে তুলনা করে অভিহিত করেছেন ‘কাইট ডিপ্লোমেসি’ বা ঘুড়ি কূটনীতি হিসেবে।
লাহোর সফর থেকে ফিরে বিসিবি সভাপতি এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেছেন বিশ্ব ক্রিকেটের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে দরকষাকষি, পাকিস্তানের নজিরবিহীন সমর্থন এবং বাংলাদেশের ক্রিকেটীয় স্বার্থ রক্ষার নেপথ্য কাহিনী।
লাহোরে ‘ঘুড়ি কূটনীতি’র নেপথ্যে
লাহোরে পা রেখেই বিসিবি সভাপতি অভাবনীয় এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। সেদিন লাহোরে চলছিল ঐতিহ্যবাহী বসন্ত উৎসব। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি তাঁকে উৎসবের ‘প্রধান অতিথি’ হিসেবে বরণ করে নেন।
আমিনুল ইসলাম বুলবুল বলেন, “বিমানবন্দর থেকে সরাসরি হলের ছাদে ঘুড়ি উৎসবে যোগ দিয়েছিলাম। সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আর ভালোবাসা দেখে মনে হয়েছে, ক্রিকেটীয় সম্পর্কের বরফ গলাতে এই উৎসবটি দারুণ এক মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। মূলত ওখানেই বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ক্রিকেটীয় বিশ্বাসের ভিত্তি তৈরি হয়।”
ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ ও বাংলাদেশের মধ্যস্থতা
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তানের ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কটের ঘোষণা আইসিসিকে এক চরম আর্থিক ও অস্তিত্ব সংকটের মুখে ফেলে দিয়েছিল। বিসিবি সভাপতি জানান, পাকিস্তান শুরু থেকেই বাংলাদেশের দাবির প্রতি জোরালো সমর্থন দিচ্ছিল। এক পর্যায়ে তারা সাফ জানিয়ে দেয়, বাংলাদেশ না খেললে তারাও খেলবে না।
আমিনুল ইসলাম বলেন, “আমার লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের মানভঞ্জন করে তাদের ভারতের বিপক্ষে খেলতে রাজি করানো। কারণ পাকিস্তান না খেললে আইসিসি এবং বিশ্ব ক্রিকেটের অপূরণীয় ক্ষতি হতো। ব্রডকাস্টার ও কমার্শিয়াল পার্টনারদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে ধস নামত। শেষ আধা ঘণ্টা ধরে তাঁদের বোঝানোর পর পাকিস্তান ক্রিকেট ও বাংলাদেশের স্বার্থে বড় ছাড় দিতে রাজি হয়।”
‘ম্যাসিভ ভিক্টরি’ ও আইসিসির নমনীয় অবস্থান
বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করা সত্ত্বেও এই পরিস্থিতিকে বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল বিজয় হিসেবে দেখছেন বোর্ড সভাপতি। তিনি জানান, শুরুতে আইসিসি বাংলাদেশকে জরিমানা বা বিভিন্ন বিধিনিষেধের হুমকি দিলেও বিসিবির অনড় অবস্থানের কারণে তারা পিছু হটেছে।
বুলবুলের ভাষ্যমতে, “আইসিসি এখন বাংলাদেশের প্রতি অত্যন্ত সদয়। আমরা তাদের সঙ্গে একটি এমওইউ স্বাক্ষর করতে যাচ্ছি। চুক্তিতে ২০২৯-৩০ সালে মেয়েদের একটি বড় টুর্নামেন্ট (বিশ্বকাপ বা চ্যাম্পিয়নস ট্রফি) আয়োজনের স্বত্ব এবং ২০৩১ সালের পুরুষ বিশ্বকাপে ভারতের সঙ্গে যৌথ আয়োজক হিসেবে ভেন্যু ও হোস্ট ফি-র ক্ষেত্রে বাড়তি সুযোগ পাওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে।”
ইগো বনাম ক্রিকেটীয় বাস্তবতা
বাংলাদেশের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব শুরুতে কেন গ্রাহ্য হয়নি, সে বিষয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেন বিসিবি সভাপতি। তিনি প্রকাশ করেন যে, আয়ারল্যান্ড ও জিম্বাবুয়ে গ্রুপ অদলবদল করতে রাজি ছিল।
“আয়ারল্যান্ড খুশি মনেই রাজি ছিল, আমার কাছে ই-মেইলও আছে। কিন্তু আয়োজক দেশ এবং আইসিসির কোনো এক পক্ষের ‘ইগো’ বা জেদ হয়তো শেষ পর্যন্ত যুক্তির চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল,” বলেন তিনি।
খেলোয়াড়দের জন্য সমবেদনা ও সরকারি সিদ্ধান্ত
একজন সাবেক অধিনায়ক হিসেবে লিটন দাস ও তাঁর দলের বিশ্বকাপ না খেলতে পারার দুঃখে সমব্যথী আমিনুল ইসলাম। তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, এটি কোনো ক্রিকেটীয় সিদ্ধান্ত ছিল না।
“নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনা করে সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা মেনে চলা আমাদের দায়িত্ব ছিল। কারণ ক্রিকেটের চেয়ে দেশ ও জাতির সম্মান এবং নাগরিকদের সুরক্ষা অনেক বড়। ব্যক্তিগতভাবে খারাপ লাগলেও সরকারের এই উচ্চতর সিদ্ধান্ত আমরা পূর্ণ সম্মান জানাই।”
আগামীর পথ
ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের টানাপোড়েন সময়ের সঙ্গে ঠিক হয়ে যাবে বলে আশাবাদী বিসিবি সভাপতি। আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি কলম্বোতে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে এশিয়ার পাঁচ দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে, যা ক্রিকেটীয় কূটনীতিতে ‘বরফ গলানোর’ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আমিনুল ইসলাম বুলবুল মনে করেন, পুরো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গিয়েও বাংলাদেশের ক্রিকেটীয় ও আর্থিক স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখতে পারাটাই তাঁর মেয়াদের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সাফল্য।

