টাইব্রেকারে রোনান সুলিভানের ঐতিহাসিক ‘পানেনকা’ শট নেওয়ার পর উল্লাস।পানেনকা শটে গোল ও শিরোপা নিশ্চিত করে রোনানের উল্লাস। ছবি: বাফুফে

পানেনকা শট—ফুটবল মাঠে ১২ গজের এই লড়াইয়ে এটি হয় কোনো ‘জিনিয়াস’-এর কাজ, নয়তো এক ‘পাগলামি’। স্নায়ুচাপের তুঙ্গে থাকা কোনো মুহূর্তে যখন গোলরক্ষককে বোকা বানিয়ে বলটি আলতো টোকায় জালের মাঝ বরাবর পাঠিয়ে দেওয়া হয়, তখন স্তব্ধ হয়ে যায় গ্যালারি। ১৯৭৬ সালে আন্তোনিন পানেনকার হাত ধরে শুরু হওয়া সেই ধ্রুপদী শিল্পের সর্বশেষ তুলির আঁচড়টি দিলেন বাংলাদেশের রোনান সুলিভান।

শুক্রবার মালদ্বীপের মালেতে ভারতের বিপক্ষে সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে রোনান যখন শেষ কিকটি নিতে যান, তখন তাঁর সামনে শুধুই ইতিহাস গড়ার সুযোগ নয়, ছিল স্যামুয়েলের মিস করা শটের পাহাড়সম চাপ। কিন্তু আমেরিকান প্রবাসী এই তরুণ বেছে নিলেন জিদান-পিরলোদের সেই অমর পথ—‘পানেনকা’।

পানেনকার সূচনা

ফুটবল ইতিহাসে পেনাল্টি মানেই গোলরক্ষকের উল্টো দিকে জোরালো শট। কিন্তু ১৯৭৬ সালের ইউরো ফাইনালে জার্মানির কিংবদন্তি সেপ মায়েরকে বোকা বানিয়ে চেক তারকা আন্তোনিন পানেনকা যখন বলটি আলতো করে চিপ করলেন, ফুটবল বিশ্ব দেখেছিল এক নতুন বিপ্লব।

ফুটবল সম্রাট পেলে সেই সাহসকে বর্ণনা করেছিলেন এভাবে— “এটি হয় একজন জিনিয়াসের কাজ, নয়তো কোনো পাগলের।” মালের জাতীয় স্টেডিয়ামে রোনান সুলিভান যখন সেই একই ভঙ্গিতে ভারতীয় গোলরক্ষক সুরাজ সিংকে পরাস্ত করলেন, তখন দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবল দেখল এক নতুন ‘জিনিয়াস’কে।

আরও পড়ুন: ভারতকে টাইব্রেকারে হারিয়ে সাফে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ

জিদান থেকে পিরলো: বড় মঞ্চের সেই দুঃসাহস

পানেনকা শট মানেই এক মনস্তাত্ত্বিক খেলা। ২০০৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে জিয়ানলুইজি বুফনের মতো গোলরক্ষকের সামনে জিনেদিন জিদানের সেই পানেনকা গোলটি এখনো ফুটবলের রূপকথা হয়ে আছে। আবার ২০১২ ইউরোতে জো হার্টকে বোকা বানিয়ে আন্দ্রে পিরলোর সেই চিপ শটটি ছিল তৎক্ষণাৎ নেওয়া এক সাহসী সিদ্ধান্ত।

পিরলোর ভাষায়, “এটি গোল করার সবচেয়ে সহজ এবং নিশ্চিত উপায় ছিল।” ঠিক একই পথে হেঁটেছেন লিওনেল মেসি, করিম বেনজেমা কিংবা উরুগুয়ের সেই ‘এল লোকো’ বা পাগল খ্যাত সেবাস্তিয়ান আব্রিউ।

পানেনকা শটে গোল করেছিলেন ফ্রান্স তারকা জিনেদিন জিদানও।
জিনেদিন জিদানের সেই ঐতিহাসিক পানেনকা শট। ছবি: গেটি ইমেজেস

রোনান সুলিভান: যেখানে ব্যর্থতা ছিল নিষিদ্ধ

পানেনকা শট যতটা শৈল্পিক, ব্যর্থ হলে ততটাই লজ্জাজনক। মরক্কোর আশরাফ হাকিমি কিংবা গ্যারি লিনেকারের মতো তারকারাও এই শট নিতে গিয়ে হাসির পাত্র হয়েছেন। কিন্তু রোনান সুলিভানের কাছে ভুলের কোনো অবকাশ ছিল না।

আরও পড়ুন: সুলিভান ব্রাদার্স: আমেরিকায় বেড়ে ওঠা বাঙালির রক্তে সাফের জয়গান

ভারতের স্যামুয়েল আগের শটটি ক্রসবারে মারার পর বাংলাদেশের শিরোপা স্বপ্ন যখন সুতোয় ঝুলছিল, তখন ডান পায়ের আলতো টোকায় বলটি জালে জড়ালেন রোনান। সুরাজ সিং ডানদিকে ঝাঁপ দিলেও বলটি মাঝপথ দিয়ে অলস ভঙ্গিতে অতিক্রম করে গোললাইন।

সাফল্যের নতুন নায়ক: কেন রোনান আলাদা?

আমেরিকায় বেড়ে ওঠা রোনান সুলিভান বাংলাদেশের জার্সিতে প্রথম এসেই যেভাবে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন, তা বিস্ময়কর। টুর্নামেন্টে তাঁর করা জোড়া গোল এবং ফাইনালের সেই ‘আইস-কোল্ড’ ফিনিশ প্রমাণ করে তাঁর ধমনিতে বইছে লড়াকু বাঙালির রক্ত আর মাথায় রয়েছে আধুনিক ফুটবলের ট্যাকটিকস।

পানেনকা শটের ৫০ বছরের ইতিহাসে রোনানের এই গোলটি যোগ করল এক নতুন মাত্রা—যেখানে একটি জাতির আবেগ আর এক কিশোরের দুঃসাহস মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।