দক্ষিণ এশিয়ার যুবদের মধ্যে সেরা গোলরক্ষক বাংলাদেশের ইসমাইল হোসেন মাহিন।সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে সেরা গোলরক্ষক হয়েছেন বাংলাদেশের মাহিন। ছবি: সাফ

কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার এক কিশোরের চোখে একসময় স্বপ্ন ছিল নীল আকাশে ডানা মেলার, পাইলট হওয়ার। কিন্তু বিধাতা তাঁর জন্য বরাদ্দ রেখেছিলেন সবুজ গালিচার মায়া। আজ সেই কিশোর ইসমাইল হোসেন মাহিন নীল আকাশ জয় করছেন ঠিকই, তবে তা গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে। সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতের বিপক্ষে টাইব্রেকারে সেই অতিমানবীয় সেভ মাহিনকে বসিয়ে দিয়েছে নায়কের আসনে। ৪ ম্যাচে মাত্র ১ গোল হজম করা এই প্রাচীর আজ দেশের ফুটবলের নতুন সেনসেশন।

বিকেএসপির ছাত্র থেকে মোহামেডানের রিজার্ভ বেঞ্চ, আর সেখান থেকে সাফ জয়ের মহাকাব্য—মুঠোফোনে নিজের সেই রূপকথার গল্প শুনিয়েছেন ইসমাইল হোসেন মাহিন। তাঁর সেই আলাপচারিতা নিয়েই এই বিশেষ প্রতিবেদন।

২০২৪ সালে নেপালের সাফেও দলে ছিলেন মাহিন। কিন্তু প্রবল জ্বরে সেবার মাঠেই নামা হয়নি তাঁর। রিজার্ভ বেঞ্চে বসে সতীর্থদের জয় দেখার সেই আক্ষেপ এবার মালদ্বীপের মালেতে মিটিয়েছেন সুদে-আসলে। পুরো টুর্নামেন্টে বাজপাখির মতো ক্ষিপ্রতায় আগলে রেখেছেন বাংলাদেশের জাল। ফাইনালে ভারতের প্রথম পেনাল্টি শটটি যখন ফিরিয়ে দিলেন, তখনই নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল—শিরোপাটা এবারও লাল-সবুজেই থাকছে।

টাইব্রেকারের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ ও আত্মবিশ্বাস

টাইব্রেকার মানেই স্নায়ুচাপের চরম পরীক্ষা। কিন্তু মাহিন ছিলেন একেবারেই শান্ত। নিজের প্রস্তুতির কথা জানিয়ে মাহিন বলেন,

“টাইব্রেকারের শুরু থেকেই মনকে বলেছি, আমাকে শট রুখতেই হবে। দলকে জেতাতে হবে। আমি ডান দিকে ঝাঁপিয়েছিলাম এবং নিচু হয়ে আসা বলটা নাগালে পেয়ে যাই। প্রথম শটটা ফেরানোর পর পুরো দল উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিল।”

৫ ফুট ১১ ইঞ্চি উচ্চতার এই গোলরক্ষক মনে করেন, বিকেএসপির কঠোর শৃঙ্খলা আর কোচদের শিক্ষাই তাঁকে চাপের মুখে স্বাভাবিক থাকতে শিখিয়েছে।

আরও পড়ুন: ভারতকে টাইব্রেকারে হারিয়ে সাফে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ

ফরোয়ার্ড থেকে গোলপোস্টের প্রহরী

মাহিনের ফুটবলার হয়ে ওঠার গল্পটা বেশ মজার। শুরুতে তিনি খেলতেন ফরোয়ার্ড হিসেবে, গোল করাই ছিল তাঁর কাজ। কিন্তু এক আন্তঃস্কুল ম্যাচে শিক্ষকের জেদেই গ্লাভস হাতে পোস্টের নিচে দাঁড়াতে হয় তাঁকে। সেই যে শুরু, এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

২০১৯ সালে বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়ার পর বাফুফে এলিট একাডেমিতে সুযোগ পাওয়া এবং সেখান থেকে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে নাম লেখানো—সবই যেন এক সুশৃঙ্খল পরিকল্পনার অংশ।

পারিবারিক বাধা ও পাইলট হওয়ার স্বপ্ন

কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান মাহিন। বাবা প্রবাসী, থাকেন কাতারে। বাবা-মায়ের ইচ্ছে ছিল ছেলে বড় হয়ে পাইলট হবে। শুরুতে খেলাধুলায় বাবার ঘোর আপত্তি থাকলেও এলাকার বড় ভাইদের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত অনুমতি মেলে।

মাহিন এখন হাসিমুখে বলেন, “আগে আব্বু চাইতেন শুধু পড়াশোনা করি। কিন্তু এখন যখন দেখেন আমি ভালো করছি, তখন তিনি আমাকে অনেক সমর্থন দেন। কুষ্টিয়া থেকে রাব্বি আহমেদ ভাইয়ের মতো সিনিয়ররা আমাকে সব সময় সাহস জুগিয়েছেন।”

আরও পড়ুন: সুলিভান ব্রাদার্স: আমেরিকায় বেড়ে ওঠা বাঙালির রক্তে সাফের জয়গান

ভবিষ্যৎ লক্ষ্য: জাতীয় দল ও বিশ্বকাপের স্বপ্ন

সাফ জয় মাহিনের কাছে কেবল শুরু। মোহামেডানের হয়ে প্রিমিয়ার লিগে নিয়মিত হওয়ার পাশাপাশি তাঁর মূল লক্ষ্য এখন জাতীয় দলের এক নম্বর গোলরক্ষক হওয়া। ২০ বছর বয়সী এই তরুণের স্বপ্নটা আরও বিশাল—তিনি চান বাংলাদেশকে একদিন বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে নিয়ে যেতে।

মালেতে শৃঙ্খলা মেনে চলা, খাবার নিয়ন্ত্রণে রাখা আর সুলিভান ভাইদের মতো প্রবাসী প্রতিভাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করা মাহিন প্রমাণ করেছেন—পরিশ্রম আর একাগ্রতা থাকলে গোলপোস্টের নিচ থেকেও আকাশ ছোঁয়া সম্ভব।