২০২৬ বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র আড়াই মাস বাকি। উত্তর আমেরিকার মাটিতে (যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা) বিশ্বসেরার লড়াইয়ে নামার আগে দলগুলো যখন তাদের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সারছে, তখন ফুটবল বিশ্বের নজর বর্তমান সময়ের সেরা ১০ তরুণ তুর্কির দিকে। পেলে ও কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো কিশোর বয়সেই বিশ্বকাপে গোল করে ইতিহাস গড়ার তালিকায় নাম লেখাতে পারেন এই নতুন প্রজন্মের সেনসেশনরা।
গোল ডটকম (GOAL) এমন ১০ জন উদীয়মান ফুটবলারকে বাছাই করেছে, যারা এবারের বিশ্বকাপে নিজেদের মহাতারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন:
১. লামিন ইয়ামাল (স্পেন)
শুধু সেরা তরুণ হিসেবে নয়, বার্সেলোনা ও স্পেনের উইঙ্গার Lamine Yamal পুরো বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার দৌড়েও এগিয়ে আছেন। ইউরো ২০২৪-এ তার বিধ্বংসী পারফরম্যান্সের কথা ফুটবল বিশ্ব এখনো ভোলেনি। আগামী ১৩ জুলাই ১৯ বছরে পা দেবেন ইয়ামাল, আর এর ছয় দিন পরই ফাইনাল জিতে বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
ইয়ামালের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ‘ওয়ান-অন-ওয়ান’ ড্রিবলিং এবং ইনসাইড কাট করে নেওয়া বাঁ-পায়ের নিখুঁত শট। ইউরোতে আমরা দেখেছি তার গোল করার ক্ষমতা, কিন্তু বার্সেলোনায় তিনি এখন একজন দুর্দান্ত প্লে-মেকার হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার ভিশন এবং রক্ষণচেরা পাস প্রতিপক্ষের জন্য আতঙ্ক।
আরও পড়ুন: ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: মাইলফলকের ৭টি অভাবনীয় তথ্য!
২. পাউ কুবারসি (স্পেন)
স্পেন দলে ইয়ামাল একা নন, রক্ষণে দেয়াল হয়ে আছেন ১৯ বছর বয়সী পাউ কুবারসি। বার্সেলোনার হয়ে গত দুই বছর ধরেই খেলছেন তিনি। রিয়াল মাদ্রিদের ডিন হুইজেনের সঙ্গে তার জুটি স্পেনের রক্ষণে নতুন প্রাণ সঞ্চার করতে পারে।
Pau Cubarsi প্রথাগত ডিফেন্ডারদের মতো শুধু বল কেড়ে নিতেই পটু নন, তিনি ‘বল প্লেইং সেন্টার-ব্যাক’ হিসেবে বিশ্বসেরা হওয়ার পথে। চাপের মুখে তার ঠান্ডা মাথার পাসিং এবং পেছন থেকে আক্রমণ গড়ে তোলার ক্ষমতা স্পেনের তিকিতাকা ফুটবলকে আরও শক্তিশালী করেছে।
৩. এস্তেভাও (ব্রাজিল)
চেলসির হয়ে ইউরোপীয় ফুটবলে ম্যাজিক দেখানো ১৮ বছর বয়সী এস্তেভাওকে নিয়ে ফুটবল বিশ্ব উন্মুখ। কার্লো আনচেলত্তির অধীনে গত বছরের শেষ দিকে ব্রাজিল দলের হয়ে ৪ ম্যাচে ৫ গোল করেছেন তিনি। ইনজুরি কাটিয়ে ফিট হয়ে ফিরলে সেলেসাওদের আক্রমণে Estevao বড় তুরুপের তাস হবেন।
ব্রাজিলে তাকে ডাকা হয় ‘মেসিনিয়ো’ (ছোট মেসি) নামে। উইং দিয়ে গতির ঝড় তুলে ভেতরে ঢুকে পড়ার ক্ষমতা তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে। চেলসি কেন তাকে নিয়ে এত আগ্রহী, তা বোঝা যায় তার গোল করার ক্ষুধার দিকে তাকালে। গতির পাশাপাশি তার সেট-পিস নেওয়ার দক্ষতাও অসাধারণ।
৪. কেন্ড্রি পায়েজ (ইকুয়েডর)
রিভার প্লেটের হয়ে খেলা চেলসির এই মিডফিল্ডার মাত্র ১৬ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক অভিষেক ঘটিয়েছিলেন। কনমেবল অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হিসেবে ইতিহাস গড়া পায়েজ ইকুয়েডরের জন্য ‘ডার্ক হর্স’ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন।
পায়েজ একজন আধুনিক ‘নাম্বার টেন’। মাঝমাঠ থেকে খেলা নিয়ন্ত্রণ করা এবং বক্সের বাইরে থেকে দূরপাল্লার শটে গোল করার এক সহজাত প্রতিভা রয়েছে তার মধ্যে। ইকুয়েডরের ইতিহাসে তিনি এমন একজন মিডফিল্ডার, যার খেলা অনেকটা লাতিন আমেরিকার ক্লাসিক প্লে-মেকারদের মনে করিয়ে দেয়।
আরও পড়ুন: বিশ্বকাপ দেখতে ৫ কোটি টাকার বাড়ি বিক্রি করছেন ইংল্যান্ডের ‘পাগল’ ভক্ত!
৫. ইব্রাহিম এমবায়ে (সেনেগাল)
ফ্রান্সের হয়ে বয়সভিত্তিক পর্যায়ে খেলা এমবায়ে গত নভেম্বরে সেনেগালকে বেছে নিয়েছেন। তেরাঙ্গার সিংহদের হয়ে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতার রেকর্ড করা এই পিএসজি ফরোয়ার্ড আফ্রিকান নেশনস কাপের ফাইনালেও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন।
পিএসজির উইঙ্গার Ibrahim Mbaye তার অবিশ্বাস্য গতির জন্য পরিচিত। প্রতিপক্ষের কাউন্টার অ্যাটাক রুখতে সেনেগালের জন্য তিনি বড় অস্ত্র। পাশাপাশি ফিনিশিংয়ে তার ক্লিনিক্যাল অ্যাপ্রোচ তাকে একজন ভয়ংকর ফরোয়ার্ডে পরিণত করেছে।
৬. গিলবার্তো মোরা (মেক্সিকো)
স্বাগতিক মেক্সিকোর বড় ভরসা ১৭ বছর বয়সী গিলবার্তো মোরা, যাকে ডাকা হয় ‘মেক্সিকান পেদ্রি’ নামে। ২০২৫ গোল্ড কাপ জয়ে বড় ভূমিকা রেখে ইয়ামালের রেকর্ড ভেঙে সর্বকনিষ্ঠ হিসেবে আন্তর্জাতিক ট্রফি জেতার কীর্তি গড়েছেন তিনি।
Gilberto Mora-কে বলা হয় মেক্সিকোর ফুটবলের প্রাণভোমরা। তার টার্নিং ক্ষমতা এবং ছোট জায়গায় বল কন্ট্রোল করার জাদুকরী দক্ষতা মেক্সিকান সমর্থকদের মনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে। প্রতিপক্ষের পেনাল্টি বক্সে জটলার মধ্যে গোল খুঁজে বের করার সহজাত ক্ষমতা তার প্লাস পয়েন্ট।
আরও পড়ুন: বিশ্বকাপের ৪৮ দল চূড়ান্ত: ব্রাজিল, আর্জেন্টিনাসহ যে গ্রুপে যারা
৭. লুকা ভুশকোভিচ (ক্রোয়েশিয়া)
৪০ বছর বয়সী লুকা মদ্রিচের শেষ বিশ্বকাপে তার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে আসছেন ১৯ বছর বয়সী সেন্টার-ব্যাক লুকা ভুশকোভিচ। টটেনহ্যাম থেকে ধারে হামবুর্গে খেলা এই তরুণ ইতিমধ্যেই ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর নজরে এসেছেন।
ভুশকোভিচের উচ্চতা তার জন্য বড় আশীর্বাদ। বিশেষ করে কর্নার বা ফ্রি-কিকের সময় হেড থেকে গোল করায় তিনি সিদ্ধহস্ত। রক্ষণ সামলানোর পাশাপাশি গত মৌসুমে হামবুর্গের হয়ে তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গোল করেছেন, যা একজন ডিফেন্ডারের জন্য বিরল।
৮. লেনার্ট কার্ল (জার্মানি)
বায়ার্ন মিউনিখের এই ১৮ বছর বয়সী সেনসেশন এবারই প্রথম জার্মানি জাতীয় দলে ডাক পেতে যাচ্ছেন। চলতি মৌসুমে বায়ার্নের হয়ে ৮ গোল ও ৬ অ্যাসিস্ট করা এই ফুটবলার জার্মানির সৃষ্টিশীল মিডফিল্ডের অভাব পূরণ করতে পারেন।
Lennart Karl মূলত একজন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হলেও উইংয়ে সমান কার্যকর। তার ক্রসগুলো নিখুঁত এবং বক্সের ভেতরে সময়মতো জায়গা নেওয়ার ক্ষমতা তাকে গোলশিকারি হিসেবে এগিয়ে রাখে।
৯. রদ্রিগো মোরা (পর্তুগাল)
পর্তুগালের ২০২৫ নেশনস লিগ জয়ী দলের সদস্য ছিলেন ১৮ বছর বয়সী রদ্রিগো। পোর্তোর এই প্লে-মেকারকে এবারের প্রীতি ম্যাচগুলোর জন্য দলে ফিরিয়েছেন কোচ রবার্তো মার্তিনেজ, যা তাঁর বিশ্বকাপের টিকিট পাওয়ার বড় সুযোগ।
পর্তুগিজ ফুটবলের নতুন রত্ন Rodrigo Mora তার সৃজনশীলতার জন্য পরিচিত। ব্রুনো ফার্নান্দেজ বা বের্নার্দো সিলভাদের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে মাঝমাঠে ছোট ছোট পাসে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভেঙে ফেলাই তার প্রধান কাজ।
১০. নাথান দে ক্যাট (বেলজিয়াম)
আন্দারলেখটের এই মিডফিল্ডার গত নভেম্বরেও অনুর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপ খেলছিলেন। কিন্তু দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে এখন বেলজিয়ামের মূল দলে জায়গা করে নিয়েছেন। নম্বর টেন হিসেবে খেলতে দক্ষ এই তরুণ বায়ার্ন মিউনিখ ও বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের রাডারেও আছেন।
দে ক্যাট মূলত একজন হোল্ডিং মিডফিল্ডার হলেও আধুনিক ফুটবলের চাহিদা অনুযায়ী তিনি এখন আক্রমণভাগেও সমান সক্রিয়। বল রিকভারি এবং দীর্ঘ পাল্লার নিখুঁত পাসিংয়ে তিনি বর্তমান বেলজিয়াম দলের অন্যতম ভরসা।

