উইজডেনের লোগো ও মোস্তাফিজুর রহমান।উইজডেনের সম্পাদকীয়তে ওঠে এসেছে মোস্তাফিজ ইস্যু। ছবি: সংগৃহিত

ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী বার্ষিক সংকলন ‘উইজডেন ক্রিকেটার্স অ্যালমানাক’-এর ২০২৬ সংস্করণে বিশ্ব ক্রিকেটের চালচিত্র নিয়ে এক বিস্ফোরক সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছেন সম্পাদক লরেন্স বুথ। তাঁর কলমে উঠে এসেছে কীভাবে ক্রিকেট এখন খেলাধুলার গণ্ডি ছাড়িয়ে রাজনীতির নোংরা দাবার ঘুঁটিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) এবং দেশটির শাসক দল বিজেপির মধ্যকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে তিনি ক্রিকেটের জন্য ‘বিষ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

বিজেপির ভূরাজনৈতিক অস্ত্র যখন ক্রিকেট

লরেন্স বুথ তাঁর ‘এডিটরস নোটস’-এ সরাসরি দাবি করেছেন যে, BCCI এখন ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির একটি স্পোর্টিং উইং বা ক্রীড়া শাখায় পরিণত হয়েছে। গত বছর এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়ের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই জয়কে সামরিক অভিযান ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর সঙ্গে তুলনা করে যে টুইট করেছিলেন, তাকে বুথ ‘চরম আপত্তিকর’ বলে উল্লেখ করেছেন।

তাঁর মতে, যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী ক্রিকেট মাঠের জয়কে প্রকৃত যুদ্ধের লাশের হিসাবের সঙ্গে মিলিয়ে দেন, তখন ক্রিকেট আর খেলা থাকে না। অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদবও এই রাজনৈতিক স্রোতে গা ভাসিয়ে জয়কে সশস্ত্র বাহিনীকে উৎসর্গ করায় বুথ তাকে ক্রিকেটের রাজনৈতিকীকরণের এক মূর্ত প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

মোস্তাফিজ ট্র্যাজেডি: গভীর রাজনৈতিক প্রতিহিংসা?

IPL 2026 নিলামে কেকেআর ৯.২ কোটি রুপিতে মোস্তাফিজুর রহমানকে কিনলেও বিসিসিআইয়ের নির্দেশে তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। লরেন্স বুথ একে সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে দেখিয়েছেন।

আরও পড়ুন: ভারতের দাপটে বিশ্ব ক্রিকেটে এখন শুধুই নীল সাম্রাজ্য!

তিনি উল্লেখ করেছেন, এটি ছিল বাংলাদেশে `হিন্দু নির্যাতনের’ অভিযোগের বিপরীতে ভারতের একপ্রকার ‘বদলা’। পাশাপাশি কেকেআর মালিক শাহরুখ খানকেও এর মাধ্যমে একটি প্রচ্ছন্ন হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে বুথ মনে করেন।

তিনি লিখেছেন, মোস্তাফিজের এই পরিণতি প্রমাণ করে যে ক্রিকেট এখন পুরোপুরিভাবে তার ‘রাজনৈতিক প্রভুদের’ হাতের খেলনায় পরিণত হয়েছে।

আইসিসির নতিস্বীকার ও বাংলাদেশের বিশ্বকাপ বর্জন

২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ না করাকে বুথ আধুনিক ক্রিকেটের এক কালো অধ্যায় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, ICC কীভাবে ভারতের বেলায় এক নিয়ম এবং বাংলাদেশের বেলায় অন্য নিয়ম অনুসরণ করে। ২০২৫ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ভারত পাকিস্তানে যেতে অস্বীকার করলে আইসিসি সব নিয়ম ভেঙে ‘হাইব্রিড মডেল’ তৈরি করে খেলা দুবাইয়ে নিয়ে যায়।

কিন্তু বাংলাদেশ যখন নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে তাদের ম্যাচগুলো ভারতের বাইরে সরিয়ে নিতে আবেদন করে, তখন আইসিসি তা সরাসরি নাকচ করে দেয়। লরেন্স বুথ একে আইসিসির ‘অরওয়েলিয়ান’ (একনায়কতান্ত্রিক ও দ্বিমুখী) শাসন ব্যবস্থা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

আরও পড়ুন: নাসের হুসেইনের তীব্র সমালোচনা: আইসিসি কি ভারতের ‘আজ্ঞাবহ দাস’?

বাজবল ও ম্যাককালাম-স্টোকস জুটির পতন

শুধু রাজনীতি নয়, ইংল্যান্ডের আক্রমণাত্মক ক্রিকেট কৌশল ‘বাজবল’ (Bazball) নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেছেন বুথ। অ্যাশেজে ৪-১ ব্যবধানে বিধ্বস্ত হওয়ার পর তিনি ব্রেন্ডন ম্যাককালাম এবং বেন স্টোকসের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসকে দায়ী করেছেন।

বুথের মতে, ম্যাককালামের এই কৌশল এখন ‘যুক্তিহীন’ এবং ‘একগুঁয়ে’ হয়ে পড়েছে। স্টোকস বাইরের যে কোনো গঠনমূলক সমালোচনাকে ‘সাবেকদের আর্তনাদ’ বলে উড়িয়ে দিয়ে দলকে এক অন্ধকার গলিদে ঠেলে দিয়েছেন। এক সময়ের বৈপ্লবিক এই বাজবল এখন স্রেফ একটি ব্যর্থ তত্ত্বে পরিণত হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

লরেন্স বুথের এই সম্পাদকীয় বিশ্বজুড়ে ক্রিকেট ভক্ত ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তাঁর মতে, ক্রিকেট মাঠ এখন মাঠ নেই, এটি এখন ভূরাজনৈতিক যুদ্ধের এক ছায়া রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।