মিরপুরের আকাশ কি কাল মেঘলা ছিল? না কি উইকেটে ছিল কোনো মায়াবী ঘূর্ণি? উত্তর—না। অথচ নিউজিল্যান্ডের ইনিংসটা থেমে গেল মাত্র ১৯৮ রানে। এক সময় মিরপুর মানেই ছিল স্পিনারদের মায়াজাল, কিন্তু কাল শেরেবাংলা দেখল অন্য এক দৃশ্য। দেখল ১৪৫ কিলোমিটার গতির এক ‘রাক্ষুসে’ বাউন্সার কীভাবে ব্যাটারের শিরদাঁড়া দিয়ে হিমস্রোত বইয়ে দেয়। দেখল এক লিকলিকে তরুণ, যার লাজুক হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে আগ্নেয়গিরির লাভা।
সোমবার (২০ এপ্রিল) কিউইদের বিপক্ষে বাংলাদেশের ৬ উইকেটের জয়টি কেবল একটি ওয়ানডে জয় নয়; এটি দেশের ক্রিকেটে এক নতুন ‘পেস বিপ্লবের’ ইশতেহারও। আর সেই ইশতেহারের প্রধান লেখক—নাহিদ রানা।
গতির জাদুকর: যখন সংখ্যাও কথা হারায়
নাহিদ রানার পরিসংখ্যান কাল অদ্ভুত এক গল্প বলছে। ১০ ওভার, ৩২ রান, ৫ উইকেট। কিন্তু এই শুষ্ক সংখ্যা কি বোঝাতে পারছে কালকের সেই আতঙ্ক? তাঁর নেওয়া ৫টি উইকেটের গতির দিকে একবার তাকানো যাক—১৪৪.৭, ১৪৬.৮, ১৪৬.১, ১৪৪.১ আর ১৪১.৬ কিমি/ঘণ্টা। বাংলাদেশের ক্রিকেটে এমন দৃশ্য বিরল, যেখানে একজন বোলারের ৫টি শিকারই এসেছে ১৪০-এর বেশি গতিতে।
আরও পড়ুন: নাহিদ রানার ‘পাঞ্জায়’ কুপোকাত নিউজিল্যান্ড
সবচেয়ে অবিশ্বাস্য ছিল তাঁর গতির ধারাবাহিকতা। ইনিংসের ১০ নম্বর ওভারের শেষ বলটিতেও যখন স্পিডোমিটার ১৪০ ছাড়িয়ে যাচ্ছিল, তখন গ্যালারিতে বসা দর্শকরাও হয়তো ঘষছিলেন নিজের চোখ। নাহিদ রানা কেবল বল করেননি, তিনি যেন মিরপুরের উইকেটে গতির গান গেয়েছেন।
‘বুলেট নিতেই হবে’: যোদ্ধার দর্শন
ইনজুরি নিয়ে অনেক পেসারের মনেই ভীতি থাকে। কিন্তু ২৩ বছর বয়সী এই তরুণের চিন্তাটা একেবারেই আলাদা। কাল সংবাদ সম্মেলনে চোটের ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন করতেই এক লড়াকু যোদ্ধার মতোই জবাব দিয়েছেন নাহিদ রানা।
তিনি বলেন, “ইনজুরি তো আগে সতর্ক করে আসে না। কিন্তু আপনি যখন যুদ্ধে নামবেন, তখন তো গুলি খাওয়ার ঝুঁকি থাকবেই। ইনজুরি খেলারই অংশ।”
এই যে ‘যুদ্ধ’ জেতার মানসিকতা, এটাই সম্ভবত নাহিদকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে দেয়। গত মাসে পাকিস্তানের বিপক্ষে ২৪ রানে ৫ উইকেট, আর কাল ৩২ রানে ৫ উইকেট—টানা দুই ওয়ানডে সিরিজে ‘ফাইফার’ নেওয়া এই পেসার প্রমাণ করেছেন তিনি কেবল ক্ষণিকের ঝলক নন, বরং লম্বা রেসের ঘোড়া।
আরও পড়ুন: নিউজিল্যান্ড সিরিজে বাংলাদেশের ‘ট্রাম্প কার্ড’ নাহিদ রানা
মুখে নয়, মাঠেই জবাব
ম্যাচ শুরুর আগে নিউজিল্যান্ডের নিক কেলি বলেছিলেন, তাঁরা সিরিজ জিততে চান। পরে সংবাদ সম্মেলনে এসে নাহিদ যেন নিকের দর্প চূর্ণ করে দিলেন এক শান্ত জবাবে। বললেন, “মুখে ক্রিকেট খেলা হয় না, মাঠেই যে ভালো করবে, সেই জিতবে।”
এই দর্প শুধু কথায় ছিল না, ছিল তাঁর লেন্থেও। প্রথম পাওয়ার প্লেতে হেনরি নিকোলসকে যখন ইনসুইংগারে এলবিডব্লিউ করলেন, সেটি ছিল ইনিংসের তাঁর প্রথম বল! এরপর উইল ইয়ংকে দেওয়া সেই ১৫০ কিলোমিটার ছোঁয়া বাউন্সার; যা কেবল ক্যাচই নেয়নি, বরং কিউই টপ অর্ডারের আত্মবিশ্বাসও কেড়ে নিয়েছিল।
কৌশল বদল: স্পিন ছেড়ে পেসের জয়গান
টাইগার ম্যানেজমেন্টের চিন্তাধারায় এক বিশাল পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে কাল। প্রথম ওয়ানডেতে ব্যাটিং সহায়ক ‘ন্যাড়া’ উইকেটে হারের পর, দ্বিতীয় ম্যাচে সবুজ ঘাসের এবং বাউন্সি উইকেট তৈরির সাহস দেখিয়েছে বাংলাদেশ। এক সময় ঘরের মাঠে নিরাপদ স্পিন-ফাঁদে খেলা বাংলাদেশ এখন পেসারদের ওপর ভরসা করতে শিখছে।
তাসকিন-শরিফুলের তৈরি করা চাপে যখন নাহিদ রানা এসে একের পর এক ‘বডি ক্রাশিং’ বাউন্সার মারেন, তখন যে কোনো বিশ্বসেরা ব্যাটিং লাইনআপের জন্যই মিরপুর এক নরক হয়ে দাঁড়ায়।
রেকর্ডের পাতায় নতুন নাম
১০ ম্যাচের ক্যারিয়ারে ১৯ উইকেট। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম ১০ ওয়ানডেতে নাহিদ রানার চেয়ে বেশি উইকেট আছে কেবল দুজনের—মোস্তাফিজুর রহমান (২৮) ও ইবাদত হোসেন (২১)। গতির কারণে হয়তো মাঝে মাঝে তিনি খরুচে হয়ে যান (যেমন আগের ম্যাচে ৬৫ রান দিয়েছিলেন), কিন্তু এই গতিই আবার ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
তাসকিন ও শরিফুলের মতো সিনিয়রদের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বপূর্ণ বন্ধন এবং ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার তাড়না তাঁকে নিয়ে যাচ্ছে অনন্য উচ্চতায়।
আরও পড়ুন: সংকটে শাপুর জাদরান: আফগান প্রেসিডেন্ট থেকে আফ্রিদি—খোঁজ নিচ্ছেন সবাই
এবং….
নাহিদ রানা আসলে কেমন? তিনি এমনই—কখনও প্রচণ্ড খরুচে, আবার কখনও ‘ভয়ংকর সুন্দর’। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত, এই তরুণের হাত ধরেই বাংলাদেশের পেস আক্রমণ এখন বিশ্বমানের এক ইউনিটে পরিণত হচ্ছে। মিরপুরের ঘাস আর নাহিদ রানার গতি—এই জুটি এখন যে কোনো দলের জন্য এক মরণফাঁদ।

