লেস্টার সিটি ফুটবলে উত্থান থেকে পতনের বড় উদাহরণ হয়ে গেছে।লেস্টার সিটি—উত্থান থেকে পতন! ছবি: স্কাই স্পোর্টস

ফুটবল বিধাতা বড় বিচিত্র! তিনি যেমন এক হাতে অবিশ্বাস্য রূপকথা লিখতে পারেন, অন্য হাতে লিখে দিতে পারেন নির্মম পতনের ইতিহাস। আজ থেকে দশ বছর আগে, ২০১৬ সালের মে মাসে যখন লেস্টার সিটির ক্লদিও রানিয়েরির শিষ্যরা ৫০০০-১ বাজির দর উল্টে দিয়ে প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা উঁচিয়ে ধরেছিল, গোটা বিশ্ব স্তব্ধ হয়ে দেখেছিল এক ‘অসম্ভব’ স্বপ্নপূরণ।

জেমি ভার্ডি, রিয়াদ মাহরেজ আর এনগোলো কান্তের সেই লেস্টার সিটি তখন ছিল পৃথিবীর কোটি মানুষের অনুপ্রেরণার নাম। কিন্তু ঠিক ৩,৬৪২ দিন পর আজ সেই কিং পাওয়ার স্টেডিয়ামের আকাশে বিষাদের সুর। হামজা চৌধুরীর লেস্টার সিটি এখন আর কেবল প্রিমিয়ার লিগ থেকে নির্বাসিত নয়, তারা ছিটকে গেছে ইংলিশ ফুটবলের তৃতীয় স্তর—লিগ ওয়ানে।

মঙ্গলবার রাতের সেই মুহূর্তটি ছিল লেস্টার সমর্থকদের জন্য এক চিলতে আশা আর পাহাড়সম হতাশার সন্ধিক্ষণ। অবনমন এড়াতে হাল সিটির বিপক্ষে জয়ের বিকল্প ছিল না ‘ফক্স’দের। ৬৩ মিনিট পর্যন্ত ২-১ গোলে এগিয়ে থেকে রূপকথার সেই লড়াকু মানসিকতা ফিরিয়ে আনার ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন হামজারা।

কিন্তু ওলি ম্যাকবার্নির সমতাসূচক গোলটি কেবল ম্যাচের স্কোরলাইন ২-২ করেনি, সেটি নিভিয়ে দিয়েছে লেস্টারের দ্বিতীয় স্তরে টিকে থাকার শেষ প্রদীপটুকুও। ৪৪ ম্যাচে মাত্র ৪২ পয়েন্ট নিয়ে ২৩ নম্বরে থাকা লেস্টারের জন্য এখন লিগ ওয়ানই অমোঘ নিয়তি।

আরও পড়ুন: আপিলেও হেরে গেল হামজার লেস্টার সিটি

উত্থানের সেই অবিশ্বাস্য গল্প

লেস্টারের এই পতনের গভীরতা বুঝতে হলে তাকাতে হবে তাদের উত্থানের দিকে। ২০১৪ সালে দীর্ঘ ১০ বছর পর প্রিমিয়ার লিগে ফিরেছিল তারা। ২০১৫ সালে অবনমন থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়ার পর শুরু হয় সেই বিশ্বজয়ী অভিযান। রানিয়েরির অধীনে ভার্ডির গোল আর কান্তের মিডফিল্ড শাসনের ওপর ভর করে শিরোপা জিতেছিল তারা।

এরপর চ্যাম্পিয়ন্স লিগের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা এবং ২০২১ সালে চেলসিকে হারিয়ে এফএ কাপ জয়—উত্তুঙ্গ সাফল্যের চূড়ায় ছিল ক্লাবটি। কিন্তু এই সাফল্যই যেন কাল হয়ে দাঁড়াল।

পতনের সিঁড়ি: অযোগ্যতা নাকি অবহেলা?

সাফল্যের চূড়া থেকে ধসে পড়া শুরু হয় ২০২২ সালের পর থেকে। কোভিড পরবর্তী সময়ে মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘কিং পাওয়ার’-এর ব্যবসায়িক মন্দা ক্লাবটির বিনিয়োগের পায়ে শিকল পরিয়ে দেয়। মালিক আয়ওয়াত ‘টপ’ শ্রীবদ্ধনপ্রভা ক্লাবটির সাথে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।

মাঠের চেয়ে বোর্ডরুমের ভুল সিদ্ধান্তগুলোই আজ লেস্টারকে এই অবস্থানে এনেছে। গত তিন বছরে সাতজন কোচ বদল করেছে লেস্টার। রুদ ফন নিস্টেলরয় এসে দলটিকে খাদের কিনারায় নিয়ে যান, যেখানে ১৬ ম্যাচের ১৫টিতেই হারতে হয় তাদের। গ্যারি রোয়েট এসেও সেই ভাঙন রোধ করতে পারেননি।

পরিসংখ্যান বলছে, চলতি মৌসুমে জেতা অবস্থান থেকে তারা রেকর্ড ৩০ পয়েন্ট হারিয়েছে, যা ইংল্যান্ডের শীর্ষ চার বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ। আর্থিক অনিয়মের কারণে ৬ পয়েন্ট কাটা হওয়া ছিল ক্লাবের ইতিহাসে প্রথম এমন লজ্জা, যা টপ-এর আমলের অব্যবস্থাপনারই ফসল।

আরও পড়ুন: হামজার জন্য লেস্টার সিটির দুই প্রতিনিধি ঢাকায়

ভবিষ্যৎ কী: ‘রিসেট’ নাকি অন্তহীন অন্ধকার?

লিগ ওয়ানে অবনমনের ফলে লেস্টারের আয় এক ধাক্কায় ৫০ শতাংশ কমে যাবে। প্রিমিয়ার লিগে থাকাকালীন ১৮৭ মিলিয়ন পাউন্ড আয় এখন নেমে আসবে মাত্র ৬০ মিলিয়নে। এর চেয়েও বড় বিপদ হলো ঋণের বোঝা।

ক্লাবটি ইতিমধ্যে অস্ট্রেলিয়ান বিনিয়োগ ব্যাংক ‘ম্যাককুয়ারি’ থেকে তাদের আগামী ২০২৭ সাল পর্যন্ত প্রাপ্য সব ‘প্যারাশুট পেমেন্ট’ অগ্রিম তুলে নিয়েছে ঋণ হিসেবে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে আয়ের পথও তারা আগেই বন্ধ করে রেখেছে।

এখন লিগ ওয়ানের নিয়মানুযায়ী আয়ের মাত্র ৬০ শতাংশ বেতনে খরচ করতে পারবে তারা। ফলে হামজা চৌধুরী কিংবা আব্দুল ফাতাউদের মতো উচ্চ বেতনভোগী খেলোয়াড়দের ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব। রূপকথার সেই নীল চাদর এখন ছিঁড়ে তছনছ; লেস্টারকে এখন শূন্য থেকে শুরু করতে হবে এক বন্ধুর পথে।

তৃণমূলের সংযোগহীনতা আর অযোগ্য নেতৃত্ব যেভাবে একটি বিশ্বজয়ী ক্লাবকে ধ্বংস করল, তা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম ট্র্যাজিক অধ্যায় হয়ে থাকবে।